হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে

হোমিওপ্যাথি কি?

হোমিওপ্যাথি জীবনীশক্তি বা প্রাণশক্তিকে উদ্দীপিত করে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রোগীকে নিরাময়ের একটি বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যা রোগীকে তার যাবতীয় শারীরিক, মানসিক, আবেগিক লক্ষণ সমূহের সাদৃশ্যের ভিত্তিতে আরোগ্য করে। হোমিওপ্যাথি এমন কিছু মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত যেখানে সদৃশ লক্ষণাবলী দিয়ে আরোগ্য করা হয় (Like Cures Like), অর্থাৎ যে পদার্থের বা ওষুধের স্থুল মাত্রা কৃত্রিমভাবে যে রোগলক্ষণ সৃষ্টি করে, সেই পদার্থের বা ওষুধের সুক্ষ্ম মাত্রায় প্রাকৃতিক সমজাতীয় রোগলক্ষণ আরোগ্য করে। এটি একটি চিরন্তন প্রাকৃতিক নীতি। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এত উচ্চ মাত্রায় তরলীকরণ বা ডাইলিউশন করা হয় যাতে ওষুধের কোন প্রকার ক্ষতিকর বিষক্রিয়া বা নেতিবাচক প্রভাব থাকেনা। হোমিওপ্যাথি কেবল রোগীকে পুর্ণাঙ্গরূপে আরোগ্যই করেনা বরং এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় অন্যারোগ্য ঘোষিত অনেক ক্রণিক রোগীকেও সফলভাবে আরোগ্য করে।

হোমিওপ্যাথির উৎপত্তি বা উৎস

চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস (৪৬০-৩৭৭ খৃষ্টপূর্ব) ”সদৃশকে দিয়ে সদৃশ্যের আরোগ্য” এই নীতির প্রবক্তা। কিন্তু হোমিওপ্যাথি বর্তমান আকারে দুই শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে বিশ্বব্যাপী সফল চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্যামুয়েল হ্যানিম্যান নামে একজন জার্মান মেডিক্যাল ডক্টর হোমিওপ্যাথির আবিষ্কর্তা যিনি তার সময়কার নির্দয় ও কঠোর চিকিৎসা ব্যবস্থায় মর্মাহত হন যেখানে চিকিৎসার অংশ হিসেবে কৃত্রিম উপায়ে রক্তক্ষরণ এবং স্থুল মাত্রায় ভয়াবহ আর্সেনিকের মত পদার্থের ব্যবহার হতো। হ্যানিম্যান এই ক্ষতিকর চিকিৎসা ব্যবস্থার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হতে বাঁচার উপায় খুঁজতে শুরু করেন। বলা বাহুল্য তখনকার চেয়ে আজ এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা হাজারো গুণে মারাত্মক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সম্পন্ন।

হ্যানিম্যান নিজের উপর এবং সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দলের উপর ওষুধের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাত্রার পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে দেখেন যে ওষুধের ক্ষতিকর বিষক্রিয়া হ্রাস পাচ্ছে এবং ক্ষুদ্র মাত্রার ওষুধ অধিকতর ফলদায়কও হচ্ছে। তিনি আরোও পর্যবেক্ষণ করলেন যে- যে সকল ওষুধে বিষক্রিয়া উৎপন্ন করে যেমন- মার্কুরী ইত্যাদি দ্বারা সিফিলিসের মত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। এটি তাকে ”সদৃশ দিয়ে সদৃশের আরোগ্য” – এই মূলনীতির দিকে পরিচালিত করে।

হ্যানিম্যান দাবী করেন এবং প্রমাণ করেন যে-

  1. প্রকৃতিতে বিদ্যমান সুনির্দিষ্ট আরোগ্য নীতি অনুযায়ীই কেবল আরোগ্য সাধিত হয়,
  2. এই প্রাকৃতিক আরোগ্য নীতির বাইরে কোন প্রকার আরোগ্যই সাধিত হয়না,
  3. প্রকৃতিতে সেই অর্থে তেমন কোন রোগ‌ই নেই, আছে কেবল রুগ্ন বা ব্যাধিগ্রস্থ ব্যক্তি,
  4. প্রকৃতিগত ভাবে রোগ সকল সময়ই গতিশীল, সুতরাং আরোগ্য করতে হলে ওষুধকে অবশ্যই গতিশীল হতে হবে,
  5. রোগীর রুগ্নতার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে কেবল একটি মাত্র নির্দিষ্ট ওষুধের প্রয়োজন,
  6. নির্দিষ্ট ঐ ওষুধটি খুঁজে পেয়ে সেবন না করানো পাওয়া পর্যন্ত রোগীর আরোগ্য সম্ভব নয়। ঐ ওষুধের অভাবে অন্য ওষুধ প্রয়োগে রোগী হয়তো বড়জোর সাময়িকভাবে স্বস্তি বা উপশম বোধ করতে পারেন।

যখনই রোগীর শরীর, আবেগ ও মনের মধ্যে সাম্যাবস্থা থাকে তখন রোগী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তিনি সুখী বোধ করেন, ব্যথা-বেদনা দূরীভূত হয়, তার মানসিক চাপ হ্রাস পায়। আর এরকম একটি অবস্থায় মানুষ নিজ নিজ দায়িত্ব দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয় এবং নিজের জীবনের মহৎ লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করে।

হোমিওপ্যাথি কি চিকিৎসা করে?

হোমিওপ্যাথি দ্বারা যে কোন রোগেরই ফলপ্রসু চিকিৎসা সম্ভব, হোক সেটি একিউট বা দীর্ঘস্থায়ী ক্রণিক রোগ। জরুরী প্রয়োজনে হোমিওপ্যাথি অন্য চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে একত্রেও কাজ করতে পারে। এ্যালোপ্যাথি বা অন্য কোন চিকিৎসা ব্যবস্থার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া উপশম করার জন্যও হোমিওপ্যাথি ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কেবল রোগলক্ষণই দূরীভূত করেনা বরং এটি রোগের কারণকেও দূর করে এবং রোগীকে রুগ্ন অবস্থার পূর্বের স্বাস্থ্যে ফিরিয়ে আনে। হোমিওপ্যাথি শারীরিক, আবেগিক, মানসিক এমনকি আধ্যাত্মিক রোগেরও চিকিৎসা করে কারণ এই প্রতিটি স্তরের লক্ষণাবলী ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত। তাছাড়া এগুলি রোগীর সার্বিক অসুস্থতারই বহিঃপ্রকাশ। এজন্য হোমিওপ্যাথিকে হলিস্টিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বলা হয়।

হোমিও চিকিৎসা কেমন?

আমাদের ওষুধগুলিকে আমরা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ বলি যাতে সক্রিয় উপাদানের একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণ আছে যে কারণে এটি অত্যন্ত কোমল ও আসক্তিহীন। বৃক্ষরাজি, খনিজ, ধাতু, প্রাণী এমনকি কিছু বিষাক্ত পদার্থ হতে ৩০০০ এরও অধিক ওষুধ যুগ যুগ ধরে সফলতার সাথে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ায় তরলীকরণ (dilution) ও সবলে ঝাঁকুনির (succession) ফলে প্রতিটি ওষুধের সহজাত নিরাময় বৈশিষ্ট্য বিকশিত ও উন্মোচিত হয়।

আপনি চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সময় যে সকল লক্ষণাদি হোমিওপ্যাথকে দেন তার উপর ভিত্তি করে হোমিওপ্যাথ সচরাচর আপনার ওষুধ নির্বাচন করেন যা ট্যাবলেট, পিল এমনকি তরল আকারে নির্দেশনা সহ সরবরাহ করা হয়। এই ওষুধটি প্রেসক্রাইব করা হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উপর ভিত্তি করে, কেবল রোগীর রোগের উপর ভিত্তি করে নয় বরং রোগীর সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে।

ওষুধ সেবনের পর আপনি কিছু পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করতে পারেন। কিছু রোগী কিছু সময়ের জন্য ব্যতিক্রমী ভাললাগা ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। কখনও বা আপনার লক্ষণাবলী স্বল্প সময়ের জন্য বৃদ্ধি হতে পারে। এটি একটি ভাল লক্ষণ, কারণ এর অর্থ ওষুধ কাজ করা শুরু করেছে। কখনও বা ঠান্ডালাগা, নানা ধরণের ফুসকুড়ি, বা নানা জাতীয় স্রাব দেখা দিতে পারে যার অর্থ আপনার সিস্টেমটি ভেতর থেকে একটি পরিচ্ছন্নতার পর্যায় অতিক্রম করছে। একইভাবে, রোগীর কিছু পুরাতন লক্ষণ খুব স্বল্প সময়ের জন্য পুনরায় দেখা দিতে পারে। এই লক্ষণগুলি একসময় আর থাকবে না, এটিতে রোগীর রোগ আর চাঁপা পড়েনা, এই পর্যায়টি আরোগ্য প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরোগ্যে কত সময় লাগে?

হোমিওপ্যাথি ভিতর থেকে আরোগ্য করে, সেহেতু আরোগ্য সাধনে কিছু সময় লাগতে পারে। রোগের কারণ ও রোগের লক্ষণ অপসারণে যদি কিছুটা সময় লাগলেও এই রকম আরোগ্যই আপনার জন্য উত্তম। এটি অবশ্যই সেই চিকিৎসার চেয়ে উত্তম যেখানে শুধু রোগ লক্ষণ দমন করা হয় এবং আরোগ্যের নামে বড়জোর সাময়িক উপশম দান করা হয়।

একটি প্রচলিত নিয়ম এই যে, কোন নির্দিষ্ট রোগে রোগী এক বছর ভুগে থাকলে তা নিরাময়ে এক মাস সময় প্রয়োজন হয়। আপনি চাইলে স্বাস্থ্যের অন্যান্য নিয়মকানুন বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটিকে তরান্বিত করতে পারেন। স্বাস্থ্যবান হওয়ার জন্য আপনি যতোটা চেষ্টা করবেন, আরোগ্য ততোটা তরান্বিত হবে। স্বাস্থ্যের মুলনীতিগুলো মেনে চললে হোমিওপ্যাথি সত্যিকার অর্থে দ্রুত কাজ করবে। যেমন- আপনাকে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে হবে, পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, যথেষ্ট বিশ্রাম গ্রহণ করতে হবে, পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। এগুলো আপনাকে দ্রুত আরোগ্য করবে। প্রথম চিকিৎসা শুরু হবার পর আমরা প্রতি ৪-৬ সপ্তাহ অন্তর আপনার কেসটি ফলোআপ করবো যেখানে আপনার কেসটি পুন:মূল্যায়ন করা হবে। ক্রণিক রোগীর প্রথম এ্যাপয়েন্টমেন্টে / সাক্ষাতটি এক থেকে দেড় ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পরবর্তী এ্যাপয়েন্টমেন্ট বা সাক্ষাতটি ৩০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে। শিশুদের জন্য কিছুটা কম সময় প্রয়োজন হয়।

আদর্শ সাক্ষাতে/অধিবেশন- হোমিওপ্যাথের যা জানা প্রয়োজন

হোমিওপ্যাথি স্বীকার করে যে এটি রোগ নয় বরং রোগীর চিকিৎসা করে। সুতরাং আপনার সঠিক ওষুধটি খুঁজে পেতে হোমিওপ্যাথের প্রয়োজন আপনার সম্পর্কে সবকিছু বিস্তারিত জানার। আপনাকে বিস্তারিতভাবে বোঝার, আপনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা রোগলক্ষণ এবং সে সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কি ইত্যাদি আপনার কেসটি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে প্রয়োজন হয়। সুতরাং আপনি যে কোন কিছুই বলতে পারেন যা সাধারণভাবে আপনাকেই বুঝাবে এবং আপনি এই পৃথিবীতে কিভাবে অনুভব করেন বা দেখেন তা এই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে। আপনার সাধারণ শক্তি স্তর বা এনার্জি লেভেলের বিষয়ে জানতে, আপনার পূর্বের চিকিৎসা ইতিহাস এবং আপনার জীবনযাত্রা প্রণালীও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বে অন্য চিকিৎসকেরা আপনাকে কি ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছিলেন বা আপনি নিয়মিত কোন্ কোন্ ওষুধ খান সেটিও হোমিওপ্যাথকে জানাতে হবে।

ফলোআপ সাক্ষাত

ফলোআপ সাক্ষাতে আপনার হোমিওপ্যাথ প্রথম সাক্ষাতে যেসব বিষয় আলোচনা করেছিলেন সেগুলিই পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন। এই প্রক্রিয়া আপনার সব উপসর্গ নিরীক্ষণ করতে হোমিওপ্যাথকে সাহায্য করে এবং তাকে অনুমতি দেয় রোগীর অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে। আর এ পর্যায়ে হোমিওপ্যাথ হয় অপেক্ষা করেন, বা কেসটি অধিক স্টাডি করেন অথবা পূর্বের প্রেসক্রিপশনটি পুনারাবৃত্তি করেন বা তা পরিবর্তন করেন। ফলোআপ এ্যাপয়েন্টমেন্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ যে কোন রোগীর প্রতি যে কোন ওষুধের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে তাদের জন্য অনন্য। এর উপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে রোগীর চিকিৎসায় অগ্রগতি কেমন হবে, কি মাত্রায় ও শক্তিতে তিনি ওষুধ প্রয়োগ করবেন ইত্যাদি সম্পর্কে হোমিওপ্যাথ ধারণা পাবেন।

error: Content is protected !!