এ্যালোপ্যাথিক বনাম হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাঃ আজ ইনশাল্লাহ লিখবো আধুনিক এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি তুলনামূলক বিবরণী। লেখায় যথাসম্ভব এ্যালোপ্যাথি ও হোমিওপ্যাথি দুটি ক্ষেত্রের খ্যাতমান চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হবে।

হোমিওপ্যাথির জনক Dr. Samuel Hahnemann বলেছেন,”দ্রুত, স্বচ্ছন্ন ও স্থায়ীভাবে আরোগ্য সম্পাদনই চিকিৎসকের একমাত্র ব্রত (The Physician’s highest calling, his only calling, is to make sick people healthy – to heal, as it is termed)”।

প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ Dr. John Clarke বলেছেন,”প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত হোমিওপ্যাথি হচ্ছে একটি ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের শিল্প বা কলাকৌশল; একই সঙ্গে এটি রেমিডি বা ঔষধের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও উন্মোচিত করে (Homeopathy is from first to last an art of individualizing. We have to individualize patients, and individualize medicines or remedies)।” কারণ রোগীর ব্যক্তস্বাতন্ত্রের সাথে ঔষধের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় না হলে আরোগ্য সম্ভব নয়।

প্রধানতঃ ৪টি মূলনীতির উপর হোমিওপ্যাথি প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলোঃ

  1. সদৃশনীতি (law of similars or similia similibus curantur, i.e. like cures like)
  2. একক সরল ঔষধ নীতি (law of single, simple remedies)
  3. শক্তিকৃত ঔষধ ব্যবহার নীতি (law of potentized remedies)
  4. ক্ষুদ্রতম মাত্রানীতি (law of minimum dose)

হোমিওপ্যাথি হলো এমন এক আরোগ্রকলা যা সম্পুর্ণভাবে প্রাকৃতিক নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত (Homeopathy is an art of healing which is based on natural healing)

হোমিওপ্যাথিতে ৫ টি আরোগ্যের নীতি (Direction of cure) আছে যাকে Hering’s law of cure বলে । সেগুলো হচ্ছেঃ

  1. চিকিৎসায় রোগ অধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হতে কম গুরুত্বপূর্ণ অংগে স্থানান্তর হবে (Symptoms heal from the most important organ to the least important organ (ie. generally from the heart to the skin which is the most superficial organ)।
  2. রোগ উর্ধাঙ্গ হতে নিম্নাঙ্গের দিকে ধাবিত হবে (Symptoms improve from the center of the body to the periphery (hands and feet)
  3. রোগ ভিতর থেকে বাইরে প্রকাশিত হবে (Symptoms should improve from above downwards) ।
  4. কেন্দ্র হতে পরিধিতে স্থানান্তরিত হবে (Symptoms improve from the center of the body to the periphery (hands and feet)
  5. রোগগুলি বিপরীতক্রমে আরোগ্যলাভ করবে (Symptoms resolve in the reverse order that they came: the most recent going away first)

বলাবাহুল্য এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার গতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলতঃ রোগ চাপা পড়ে, নতুন জটিলতা দেখা দেয়া এবং নতুন রোগ সৃষ্টি হয় যা রোগীর জীবন বিপন্ন করে তোলে।

এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় মূল রোগ দৃশতঃ আরোগ্য হয়েছে বলে মনে হলেও যদি রোগীর দেহ-মনে অন্য কোন রোগের জটিলতা বা নতুন রোগ দেখা দেয় তাহলে রোগী সঠিক পন্থায় আরোগ্যলাভ করেনি বলে প্রমাণিত হয়। সঠিক পন্থাটি হলো রোগটি আরোগ্যলাভ করবে কিন্তু কোন ক্ষতিকর প্রভাব রেখে যাবেনা বা তার বৃদ্ধি ঘটাবে না বা নতুন রোগের সৃষ্টি করবে না।

প্রখ্যাত এ্যালোপ্যাথ Goodman and Gilman’s তাঁদের “Pharmacological Basis of Therapeutics” (5th Edition 1975), যাকে আধুনিক ফার্মাকোলজির শেষ কথা বলে বিবেচনা করা হয় সেখানে উল্লেখ করেনঃ ”কোন এ্যালোপ্যাথিক ঔষধই তার বিষক্রিয়ার প্রভাব হতে মুক্ত নয়…সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঔষধ শিল্পে যে ব্যাপক উৎপাদন বন্যা বয়ে যাচ্ছে তাতে কিছু ক্ষেত্রে যদিও কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে কিন্তু এর ক্ষতির পরিমাণও বহুগুণ বেশী। প্রতি বছর প্রস্তুতকৃত নতুন ঔষধের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র উল্লেখযোগ্য কিছু অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করে।”

অন্য একজন প্রখাত এ্যালোপ্যাথ Dr. Illich বলেন আধুনিক বৈজ্ঞানিক কলা কৌশল বা কারিগরী উৎকর্ষসাধনের প্রভাবে ঔষধের ক্ষতিকর প্রভাব যেকোন মহামারী প্রাদুর্ভাবের ক্ষতি ও অনুপাতকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক Dr. Mahler মনে করেন বিক্রিত মাত্র ২% ঔষধ মানুষের জন্য অপরিহার্য; বাকী ৯৮% ঔষধ যা রোগীকে সেবনে বাধ্য করা হচ্ছে তার আদৌ কোন প্রয়োজন নেই (barely 2% of the drugs sold are essential. The remaining 98% of the drugs being forced to take by the patients are not necessary at all)।

Dr. Harris L Coulter  তার “Divided Legacy” গ্রন্থে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার বিষয়ে লেখেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঔষধ উৎপাদনে বিপুল পরিমান বিনিয়োগ সত্ত্বেও তার প্রকৃত বিনিয়ম বা প্রাপ্তি ন্যুনতম। এর ফলে শিল্পোন্নত দেশের মানুষের প্রত্যাশিত জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হয়েছে এবং আথ্রাইটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়বেটিস, এ্যাজমা এবং অন্যান্য ক্রণিক রোগের উর্ধগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর ভুল চিকিৎসাজনিত কারণে ডাক্তার কর্তৃক উদ্ভাবিত রোগের সংখ্যা বাড়ছেই।”

সম্প্রতি সর্ব-ভারতীয় খ্যাতমান বৈজ্ঞানিকদের একটি সিম্পোজিয়ামে বৈজ্ঞানিকেরা এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পর্কে কঠোরভাবে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। শিশুদের Tetracycline  ব্যবহারের কারণে প্রাপ্ত বয়স্ক হলে হাড় ও দাঁতের বিকৃতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। Chloromyctin বোন ম্যারোকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে ফলত স্বাভাবিক রক্ত গঠনে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অন্য ঔষধের সাথে ঘুমের ঔষধের ব্যবহার রোগীর ভবিষ্যত স্বাস্থ্যে অনেক ভয়াবহ বিশৃংখরার সৃষ্টি করছে। তথাপি দ্বিতীয়বার চিন্তা ভাবনা না করে এজাতীয় ঔষধগুলো  রোগীকে অনবরত প্রয়োগ করা হচ্ছে।

David M. Spain  তাঁর “The Complications of Modern Medical Practice” (1963), গ্রন্থে লেখেন “latrogenesis বা মানুষের মাঝে রোগ সৃষ্টির কারণের একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে ডাক্তার দ্বারা সৃষ্ট রোগ”।

এখন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যাকঃ

  1. হোমিওপ্যাথি একটি হোলিস্টিক মেডিসিন যার প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে রোগ থেকে মুক্ত রাখা এবং রোগের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জোরদার করে তোলা।
  2. হোমিওপ্যাথি প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যর বিষয়টি বিবেচনায় আনে এবং ফলতঃ রোগীর জন্য সঠিক প্রযোজ্য ঔষধটিই প্রদান করে।
  3. হোমিওপ্যাথিক ঔষধের শক্তিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টি বা স্বাতন্ত্র্য ও ঔষধের স্বাতন্ত্র্যর সাথে মিল রেখে শক্তি নির্ধারণ ও প্রয়োগ করা হয়।
  4. হোমিওপ্যাথি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে প্রতিটি মানুষের আঙ্গুলের ছাপ যেমন পৃথক ও স্বতন্ত্র তেমনি প্রতিটি মানুষের রোগও স্বতন্ত্র ও পৃথক। সুতরাং রোগীর ঔষধটি নির্বাচন করা হয় তার একক ও স্বতন্ত্র অবস্থার কথা বিবেচনা করে; কখনও রোগের সাধারণ লক্ষণের উপর ভিত্তি করে নয়।

হোমিওপ্যাথিতে যদি রোগলক্ষণসমষ্টির উপর ভিত্তি করে মানুষকে একটি একক ও সতন্ত্র সত্ত্বা হিসেবে বিবেচনা তার জন্য উপযুক্ত শক্তি ও মাত্রার ঔষধ প্রয়োগ করা হয় তবে দ্রুত, নির্মল ও পার্শপ্রতিক্রিয়াহীন আরোগ্য সাধিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *