রোগীর লক্ষণবলী সংগ্রহ করে তার স্বাতন্ত্র্যসূচক লক্ষণাবলী শ্রেণীবদ্ধ করার পর অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ কোন না কোন কৌশল অবলম্বন করেন যা তাঁকে সঠিক ওষুধ নির্বাচনে সহায়তা করে। হোমিওপ্যাথি যেহেতু ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিজ্ঞান (science of individualization) সেহেতু নির্দিষ্ট রোগীর জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ খুঁজে পাওয়া যুক্তিনির্ভর একটি প্রক্রিয়া। প্র্যাকটিসে সর্বাধিক সাফল্য অর্জনের জন্য হোমিওপ্যাথকে ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়াটি অতিক্রম করতে হয়। অনবরত প্র্যাকটিসের মাধ্যমেই তিনি এই সামর্থ অর্জন করেন। এই প্রক্রিয়ার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সকল ধাপে হোমিওপ্যাথ হোমিওপ্যাথির মৌলিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে তিনি ধীরে ধীরে একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন। আর এই অন্তর্দৃষ্টিই তাঁকে কঠিন ও জটিল কেস অতি সহজভাবে সমাধানের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস প্রদান করে। তিনি বুঝতে পারেন কোন্ কোন্ লক্ষণ তিনি কিভাবে বিবেচনায় এনে কি কৌশল কাজে লাগিয়ে, কিভাবে বিশ্লেষণ করে রোগীর জন্য সঠিক ওষুধটি নির্বাচন করবেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে হোমিওপ্যাথ অভিজ্ঞতা অর্জন করে প্রকৃত অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথে রূপান্তরিত হন।

হোমিওপ্যাথির মৌলিক নিয়মাবলীর তোয়াক্কা না করে ২০-৩০-৪০ বছরে যতই রোগী দেখুন না কেন কোন হোমিওপ্যাথই অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ দাবী করতে পারেন না।

অন্যদিকে ভিন্ন ভিন্ন স্বাতন্ত্র্যসূচক লক্ষণের সমন্বয়ে নানা কলাকৌশলের ব্যবহারে রোগীর কেস বিশ্লেষণে হোমিওপ্যাথ প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন যাতে করে তিনি সুষম ও সফল প্রেসক্রিপশনে পৌঁছাতে পারেন। কোন কোন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ এমন কিছু লক্ষণকে ত্যাগ করেন যা নবীন হোমিওপ্যাথের নিকট প্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কারণ, অভিজ্ঞতার ফলে তিনি অতি দ্রুত বুঝতে পারেন যে ঐ নির্দিষ্ট লক্ষণটি সঠিক ওষুধটি খুঁজে পেতে তাকে সহায়তা করবে না। তাঁরা বুঝতে পারেন ঐ লক্ষণগুলো কেবল রোগীর দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি পরিচয় মাত্র যার দ্বারা ভাল প্রেসক্রিপশন করা সম্ভব নয়। অথবা তারা রোগীর অন্তর্নিতিত স্তর (underlying layer)। উপরের স্তরটির নিরাময় না করে ঐ স্তরে কাজ করা যায়না। তাছাড়া হোমিওপ্যাথির লক্ষ্য রোগীকে স্থায়ী আরোগ্যদান। অথচ এই প্রক্রিয়াটি প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রেই পৃথক ও বিচিত্র। অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের এই ক্রিয়াকলাপ নবীন ও অনভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথকে কখনও কখনও কঠিন সমস্যার সম্মুখীন করে বা তাকে ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়। সে বুঝতে পারে না কিভাবে একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ সঠিক প্রেসক্রিপশনে পৌঁছালেন। অনেক সময় তারা একে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের সুচতুর অনুমান (intuition) বলে মনে করে। প্রকৃতপক্ষে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের এই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা তাঁর বহু বছরের সুশৃংখল ও নিয়মতান্ত্রিক পরিশ্রমের ফলে অর্জিত হয়েছে। পুন: পুন: মেটেরিয়া মেডিকা অধ্যয়ন এবং হোমিওপ্যাথির অন্তর্নিহিত তত্ত্বের ক্রমাগত চর্চাই তাঁকে এই অন্তরদৃষ্টি দান করে অভিজ্ঞতার এই পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। তথাপি সবচেয়ে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথেরও সকল সময় সতর্ক থাকা উচিত যাতে কখনই তিনি কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীর রোগীকে কোন নির্দিষ্ট ওষুধের প্রতি অনুরাগ বশত যেন রুটিনমাফিক প্রেসক্রিপশন না দেন।

রোগীর লক্ষণাবলীর গভীরে না গিয়ে ভাসা-ভাসাভাবে (superficially) প্রেসক্রাইব করার ফলে অনেক নবীন হোমিওপ্যাথ প্রথমেই ব্যর্থতার পরিচয় দেন। একসময় এই ভাসা-ভাসাভাবে শর্টকাজ প্রক্রিয়া অবলম্বনের জন্য তার মধ্যে হতাশা দেখা দেয় ও তিনি হোমিওপ্যাথি ছেড়ে দেন। হোমিওপ্যাথিতে পঙ্কিলতার আশ্রয় নিয়ে শর্টকাটের মাধ্যমে ভাসা-ভাসা উপায়ে প্রেসক্রাইব করলে ব্যর্থতা অনিবার্য।

অপরপক্ষে, অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের আছে একটি মানসিক সক্ষমতা যার পিছনে আছে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করার দক্ষতা, যা অনেক বেশী কষ্টকর, ক্লান্তিকর ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু এজাতীয় হোমিওপ্যাথই সফলতার সাথে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.