অ্যান্টিবায়োটিকঃ আহ্ কি বিস্ময়কর ঔষধ!

ডা. বেনজীর আহমেদ একজন কনসাল্টেন্ট হোমিওপ্যাথ। বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

১৯২৯ সালে Sir Alexander Fleming পেনিসিলিন (Penicillin) আবিষ্কার করে চিকিৎসা জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন আর এর মাধ্যমেই অ্যান্টিবায়োটিক যুগের সূচনা হয়। তখন থেকেই আশ্চর্যজনক (?) এ ঔষধটি (wonder drug) যাবতীয় সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতে থাকে। অতি দ্রুত ব্যাকটেরিয়ার অনেক প্রজাতি (many strains of Bacteria) পেনিসিলিন প্রতিরোধী (resistant) হয়ে উঠতে থাকে। অধিকন্তু, পেনিসিলিনের ক্রমবর্ধমান ও অবাধ ব্যবহারের ফলে এর অনেক বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া ও বিষাক্রিয়া  (dangerous toxic manifestations) প্রকাশ পেতে থাকে। যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত হরেক রকমের অধিক শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হচ্ছে যার পার্শ্বপ্রতিক্রয়া পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে বহুগুণে বিপজ্জনক। সাধারণভাবেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অস্থিমজ্জার (bone marrow) স্বাভাবিক কার্যাবলীকে ব্যাহত করে বা দমিয়ে রাখে। এটি মানুষের অন্ত্রে (intestines) অতি প্রয়োজনীয় অনুজীবকে (useful micro organisms) নিধন করে অধিক রোগ সংক্রমনের নেতৃত্ব দেয় এবং এরা ক্রটিপূর্ণ (malabsorption) উপায়ে ক্ষুদ্রান্ত্র দ্বারা খাদ্য উপাদানের অপূর্ণ শোষণ করে থাকে। যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াস্বরূপ রোগীর এলার্জি, শক এমনি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

Davidson তার Text Book (1977) – এ এই বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেণ যে, “Antibiotics must not be prescribed unless absolutely necessary” অর্থাৎ “একান্তই প্রয়োজনীয় না হলে অবশ্যই অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করা উচিত নয়”। তিনি আরও বলেন, “Many adverse effects and even death may result from the use of antibiotics” অর্থাৎ “অ্যান্টিবায়োটিকের অনেক বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে, এমনকি এর দ্বারা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে”।

আশার কথা, ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে এমন একটি উপলব্ধি এসেছে যে, ব্যাকটেরিয়া প্রকৃতপক্ষে আমাদের পরিবেশেই বিদ্যমান; এমনকি আমাদের দৈহিক সিস্টেমেও। তবে ব্যাকটেরিয়া তখনই রোগসৃষ্টি করতে পারে যখন এর আবাসস্থল বা আশ্রয়স্থল স্বয়ং ঐ মানুষটিই প্রকৃতপক্ষে অসুস্থ বা রুগ্ন হয়। তাই ব্যাকটেরিয়াকে সমূলে নিধন করার চেয়ে এখন দৃষ্টি ঘোরানো হচ্ছে সেই ক্ষেত্রটির বা আশ্রয়স্থলটির দিকে যা ব্যাকটেরিয়ার উপযুক্ত আশ্রয়স্থল। ইদানীং ব্যাকটেরিয়ার আশ্রয়স্থলটিকে সংশোধন বা সংস্কার করতেই বৈজ্ঞানিকরা জোর তাগিদ দিচ্ছেন। কারণ আশ্রয়স্থলটি ক্রটিপূর্ণ বা দোষযুক্ত হলে ব্যাকটেরিয়াকে আকর্ষণ করবেই।

এখানে উল্লেখ্য যে, তথাকথিত ব্যাকটেরিয়াঘটিত অনেক রোগের চিকিৎসায় সঠিক শক্তি ও মাত্রার হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবনের ফলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে রোগী পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেছে। এর প্রমাণ দক্ষ হোমিও ডাক্তারের কাছে ভুরি ভুরি আছে। চিকিৎসান্তে ঐ রোগীকে পরীক্ষা করে ব্যাক্টেরিয়ার আর কোন অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। অথচ এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীকে ৫ থেকে ৭ দিনের কোর্স হিসেবে পর পর ২/৩ দফা কড়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা অপরিবর্তনীয় বা অবনতিশীল দেখা যায়। ক্ষেত্র বিশেষে রোগটি চাঁপা পড়লেও বা তথাকথিত আরোগ্য সাধিত হয়েছে বলে দাবী করা হলেও অ্যান্টিবায়োটিকের দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হাত হতে রেহাই পাবার কোনই উপায় নেই।

বিখ্যাত অনুজীব বিজ্ঞানী (microbiologist) Louis Pastuer সুস্পষ্টভাবে বলেন “Microbe is nothing, the ground is all”. অর্থাৎ “জীবানু প্রকৃতপক্ষে কিছুই নয় ক্ষেত্রটাই সব”। আর এই ক্ষেত্রটাই হচ্ছে আমাদের মানবদেহ। সার্বিক বিবেচনায় মানবদেহ বা human organism হলো “a combination of mental, emotional, physical aspects as well as spirituality”. এর কোনটিকেই বাদ দিলে মানুষকে আর পূর্ণ মানুষ ভাবা যায়না। আর মানুষটি সুস্থ থাকলে সবখানেই একটি সুন্দর-ছন্দ-সমন্বয় বিরাজ করে। আর সে অসুস্থ হলে নানা প্রকার রোগ-ব্যাধি/ব্যাকটেরিয়ার/ভাইরাসের আবাসস্থলে পরিণত হয়। দেহ মন-মননে কোন ছন্দ-সমন্বয় থাকেনা। অন্য কথায় আগে মানুষটি অসুস্থ হয় পরে ব্যাকটেরিয়ার আবির্ভাব ঘটে। ভুলবশতঃ আমরা কারণটি অনুসন্ধান না করে ফলাফল নিয়ে মাতামাতি করি। এটি মারাত্মক ভ্রান্তি!

Man and his future’ গ্রন্থে Hilary Koprowskin লিখেছেন, “ভবিষ্যতে জীবানুমুক্ত মানবজাতির স্বপ্নদেখাটাই হবে সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। মানুষকে এই সংক্রমনের মাঝেই একটি সুন্দর পরিবেশবান্ধব সমন্বয় সাধন করে স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করতে হবে, যাকে ড্রাগ থেরাপীর হিংস্র বা বণ্য প্রয়োগ দ্বারা বিপর্যস্ত বা বিপন্ন করার চেষ্টাই হবে ব্যর্থ প্রচেষ্টা।” আর এ প্রচেষ্টার ফলে নতুন নতুন অনারোগ্য ও ক্রণিক রোগের তালিকা হবে দীর্ঘতর। তাই আশ্রয়স্থলটিকে রক্ষা করার ও জীবাণুর সাথে সমন্বয় করে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে মানুষ অনেক অনাগত, অনারোগ্য ক্রণিক রোগের হাত হতে বেঁচে থাকবে। হয়তো কিছুটা ছোটখাটো একিউট রোগে মানুষ ভুগবে যার অধিকাংশই বিনা চিকিৎসায় অর্থাৎ কোন ঔষধ ছাড়াই শুধুমাত্র শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা জীবনীশক্তির মাধ্যমেই নিরাময় সম্ভব।

বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী Rene Dubos দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, “এটা খুব ভালভাবেই জানা আছে যে, জীবানুগুলো সুস্থ মানবদেহে উপস্থিত থাকেনা। ব্যক্তির অসুস্থতাই এর আবাসস্থল বা আশ্রয়স্থল তৈরীব করে। প্রশ্ন হচ্ছে ব্যক্তি কেন তাহলে অসুস্থ হয়? সংক্ষেপে জবাব হলো- খানিকটা বংশগত প্রবণতার জন্য (genetic predisposition), খানিকটা বিশৃংখল জীবনযাত্রা প্রণালীর জন্য (Imbalanced  lifestyle), খানিকটা ঔষধের অপপ্রয়োগের জন্য (Suppressive Treatments)। জীবাণু রোগের কারণ হতে পারে না; জীবাণু রোগের ফলাফল। অতএব, জীবাণু ধ্বংস করার অর্থ হচ্ছে রোগের ফলাফল (effect) ধ্বংস করা, কারণটিকে নয়”।

Harrison’s  text book of Medicine হতে আরেকটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক, “মানবদেহ নামক হোস্ট ফ্যাক্টরের গভীর প্রভাব রোগ  সংক্রামণের পদ্ধতিটিকে স্পষ্ট করে তোলে, তথাপি তাদের বোঝার ব্যাপারে যদি কখনও আমরা এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছাতে পারি যা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের সামর্থ দেবে এবং জীবাণুর ভবিষ্যত ধরণ সম্পর্কে ধারণ দেবে; তখন আমরা সংক্রামক রোগকে নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবো। তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে ও ঔষধ শিল্পে গবেষণা বা অনুসন্ধানের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও উর্বর আর কোন ক্ষেত্র থাকবেনা।” কিন্তু সে সম্ভাবনা অতিশয় ক্ষীণ।

University of Minnesota, USA– এর একজন পেডিয়াট্রিক কিডনীরোগ বিশেষজ্ঞ Dr. Ronald J. Glasser, ১৯৭৬ সালে তার প্রকাশিত বিখ্যাত বই “The Body is the Hero” তে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, কিভাবে আমাদের শরীর প্রতি মুহূর্তে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যায় এবং অনেক সংগ্রামের মধ্যে বেঁচে থাকে।

তাঁর কয়েকটি উদ্ধৃতি নিম্নে সংক্ষিপ্তাকারে আকারে উল্লেখ করা হলোঃ

“অ্যান্টিবায়োটিকের মত সকল অ্যালোপ্যাথিক  ঔষধই মানুষের সময়কে কিনে নেয়। তারা মানবজীবনকে দমন-পীড়ন করে, মানবের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে শ্লথ করে দেয়, তারা কিছু মানুষকে হত্যাও করে। সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় যত মহান কারিগরী অর্জন তা আমাদের একটি খাদের কিনারে এনে দাড় করিয়েছে। এর অধিক কিছুই না।”

স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষতার যুগে এক অনুপম নিরাপত্তার অনুভূতি নিয়ে আমরা ঘুমাতে যাই। কিন্তু আসলে ঐ নবজাত শিশুটির জন্য এর কোন কিছুই কাজ করেনা; কারণ সে জন্মেছে কোনপ্রকার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়াই (born with immunodeficiency disease)। না কোন ঔষধ, না কোন অ্যান্টিবায়োটিক তাকে বাঁচাতে পারে। সে জন্মেছে রোগের বিরুদ্ধে ন্যুনতম প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়াই। তাই সর্বোচ্চ চিকিৎসা, ঔষধ, অ্যান্টিবায়োটিক, তার কোন কাজেই আসবেনা। ডাক্তারের শেষ মন্তব্য – “জীবনীশক্তি বিলুপ্ত, তাই ঔষধ ধরছে না“। এটাই তার শেষ কথা। আর হোমিওপ্যাথির শুরুটাই এখানে। জীবনীশক্তিকে বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জোরদার করাই হোমিও চিকিৎসার প্রথম কাজ। তাই বলা হয়- হোমিওপ্যাথিই ভবিষ্যত চিকিৎসা ব্যবস্থা (De medicina futura). Homeopathy is far ahead of time.

পর্যাপ্ত প্রমাণসহ বলা যায়, আমাদের নিজস্ব রোগনিরাময় ব্যবস্থা অর্থাৎ শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা জীবনীশক্তি ব্যতিত অ্যান্টিবায়োটিকের তেমন কিছুই করার নেই। সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, প্রতিবার অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের স্তর এবং তার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অধিক নিম্নগামী হচ্ছে।

অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার যদি সঠিক পন্থায়, যথাশক্তি ও মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ করেন তবে তা আমাদের জীবনীশক্তি তথা প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উজ্জীবিত করবে যা প্রকৃতপক্ষে রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, রোগীকে সার্বিকভাবে আরোগ্য দান করবে। ফলতঃ রোগী পূর্ণ স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.