মানবের সমগ্র সত্ত্বাকে মানসিক (mental) আবেগিক (emotional) এবং শরীরিক (Physical) এই ৩ টি ভাগে ভাগ করা হয়। এদের মধ্যে মানসিক স্তরটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, এর পর আবেগিক ও শারীরিকের স্থান। তথাকথিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অবশ্য এসবের ধার ধারেন না। কিন্তু একজন দক্ষ হোমিওপ্যাথ মানুষের প্রতিরোধ ব্যবস্থার (defence mechanism) শক্তি সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন ৩টি স্তর সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। এজন্য রোগীর শরীর, আবেগ ও মনের কোথায় কি ঘটছে সে খবরাখবর তাকে নিতেই হবে। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করলে সেটি সর্বদাই চেষ্টা করে রোগকে ত্বক, শৈষ্মিক ঝিল্লী বা মিউকাস মেমব্রেণ এবং মাংসপেশী ইত্যাদি প্রান্তদেশে (periphery) বা অগভীর (superficial) অংশে সীমিত রাখতে। এভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ অংগ প্রত্যঙ্গ (vital organ) যেমন – মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড, যকৃত, কিডনী, ফুসফুস ইত্যাদিকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। আধুনিক চিকিৎসা ঠিক এর উল্টো পথে হাটে।

হোমিও চিকিৎসা সফল হলে আমরা লক্ষ্য করি যে রোগটি গভীর অংগপ্রত্যঙ্গ হতে অগভীর অংগে স্থান পরিবর্তন করছে। এর অর্থ হচ্ছে আরোগ্যের গতিটি (direction of cure) মানসিক স্তর হতে আবেগের স্তর এবং সর্বশেষ দৈহিক স্তরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অথবা বলা যায় রোগটি একই স্তরের গভীর এলাকা হতে অগভীর এলাকায় স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং এভাবেই প্রান্তদেশের মাধ্যমে রোগটি শরীর হতে বিদায় নিচ্ছে ও রোগী একসময় সুস্থ হচ্ছেন। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় কোন আরোগ্যের গতি নেই। ফলতঃ আজ যিনি চর্মরোগী কাল তিনিই কিডনী, ফুসুফুসের রোগীতে পরিণত হন, আজ যিনি ঠান্ডা-সর্দি-কাশির রোগী কাল তিনি হাঁপানী কিংবা যক্ষ্মা রোগীতে পরিণত হন।

হোমিওপ্যাথিতে একজন চিকিৎসককে  পুরো রোগীকেই বুঝতে হয়। রোগী কতটা জটিল তা জানতে গুরুত্বানুসারে ৩টি স্তরের রোগের ক্রম জানাটি জরুরী। এই ক্রমটির অগভীর হতে গভীরতার ধাপটি (in descending order) হলো নিম্নরুপঃ

মানসিক স্তরের (mental) রোগ লক্ষণাবলীর ক্রমঃ (১) অনুপস্থিত মন (absent mindedness) (২) বিস্মৃতি (forgetfulness) (৩) একাগ্রতার অভাব (lack of concentration) (৪) নিষ্প্রভতা (dullness) (৫) নিশ্চেষ্টতা (lethargy) (৬) বিভ্রম (delusions) (৭) ভীতু ধারণা (paranoid ideas) (৮) ধ্বংসাত্মক প্রলাপ বা চিত্তবিকার (destructive delerium) এবং (৯) সম্পূর্ণ মানসিক বিভ্রান্তি (complete mental confusion)।

আবগিক স্তরের রোগ লক্ষণাবলীর ক্রমঃ (১) অসন্তোষ (dissatisfaction) (২) বিরক্তি বা রোষপ্রবণতা (irritability) (৩) উদ্বেগ-উৎকন্ঠা (anxiety) (৪) আতংক, বিতৃষ্ণা বা ঘৃণা (phobias) (৫) নিদারূন মানসিক যন্ত্রণা বা চিত্তদাহ (anguish) (৬) বিষন্নতা বা স্ফূর্তিশুন্যতা (sadness / depression) (৭) উদাসীনতা বা অরুচি (apathy) (৮) আত্মহত্যামূলক বিষন্নতা (suicidal depression)।

শারীরিক স্তরে রোগ লক্ষণাদির ক্রমঃ (১) চর্মরোগ (skin ailments) (২) মাংসপেশীর রোগ (muscle ailments) (৩) হাঁড় বা অস্থির রোগ (bone ailments) (৪) প্লীহার রোগ (spleen ailments) (৫) পরুষ ও স্ত্রী প্রজনন তন্ত্রের রোগ (male & female reproductive ailments) (৬) কিডনীর রোগ (kidney ailments) (৭) ফুসফুসের রোগ (lung ailments) (৮) যকৃতের রোগ (liver ailments) (৯) অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির রোগ (endocrine ailments) (১০) হৃদরোগ (heart ailments) এবং (১১) মস্তিষ্কের রোগ (brain ailments)।

উল্লেখ্য যে রোগীর শারীরিক স্তরে কোন অংগ প্রত্যংগ সরাসরি রোগাক্রান্ত না হয়ে যদি সেই অংগের কার্যগত কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তবে রোগী দ্রুত আরোগ্য হন। যেমন – রক্ত সঞ্চালন রোগের আরোগ্য সম্ভাবণা অবশ্যই হৃদরোগের চেয়ে ভাল। আবার মূত্রনালীর রোগের ভাবীফল কিডনী রোগের চেয়ে অনেক ভাল।

শারীরিক স্তরে প্রায় প্রতিটি রোগেরই মানসিক বা আবেগিক রোগের সাথে নিবিড় সংযোগ আছে। অনুসন্ধিৎস্যু হোমিওপ্যাথের চোখে তা ধরা পড়বেই। ব্যতিক্রম কেবল দুর্ঘটনায় সৃষ্ট রোগসমূহ। আবার কোন কোন দুর্ঘটনা জনিত ট্রমা মন ও আবেগকে গভীরভাবে স্পর্শ করে রোগীকে জটিল করে তোলে।

বলা বাহুল্য মানসিক, আবেগিক ও শারীরিক প্রতিটি স্তরের অধীনে অসংখ্য রোগলক্ষণাদি রয়েছে। আজ শুধু শারীরিক কোন স্তরে কি রোগ দেখা যায় তা অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো। যেমনঃ ১. মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত যাবতীয় স্নায়বিক রোগ যেমন – ভয়, বদমেজাজ, সহজেই বিক্ষুব্ধ বা বিচলিত বা স্নায়ুচাপে পীড়িত, যাবতীয় স্নায়বিক দুর্বলতা, ২. হৃদরোরোগের সাথে যুক্ত রক্ত সঞ্চালনব্যবস্থার যাবতীয় রোগ, ৩. অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির রোগের সাথে যুক্ত হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারী গ্লান্ড, পিনিয়্যাল গ্লান্ড, থাইরেয়েড, এড্রেনাল গ্লান্ডের রোগসমূহ, ৪. যকৃতের রোগের সাথে যুক্ত অগ্ন্যাশয় ও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল নালীর যাবতীয় রোগ, ৫. ফুসফুসের সাথে যুক্ত শ্বাসনালীর যাবতীয় রোগ যেমন – হাঁপানী, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা সর্দি-কাশি, ঠান্ডা লাগার প্রবণতা ইত্যাদি, ৬. কিডনীর অধীনে যাবতীয় মূত্রনালীর রোগ, ৭. পরুষ ও স্ত্রী প্রজনন তন্ত্রের রোগ – যাবতীয় যৌন সমস্যা, বন্ধ্যাত্ব, ৮. প্লীহার যাবতীয় রোগ, ৯. হাঁড় বা অস্থির রোগের সাথে যুক্ত – অস্থি সন্ধি, তরুনাস্থি, কোমলাস্থির রোগ,  ১০. মাংসপেশীর রোগ – সন্ধিবন্ধনী বা মৈত্রীবন্ধনীর রোগ, ১১. চর্মরোগের সাথে যুক্ত যাবতীয় শেষ্মিক ঝিল্লীর রোগ।

একজন দক্ষ হোমিওপ্যাথকে উপরোক্ত ৩টি স্তর ও তার যাবতীয় রোগলক্ষণাবলী সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। তথাকথিত নাক-কান-গলা বা মেডিসিন বা চর্ম-যৌন বা হৃদরোগ বা হাঁপানী বা কিডনী বা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কোন মূল্য এখানে আদৌ নেই। কারণ নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চোখের বা দাঁতের রোগ বোঝেন না, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কিডনীরোগ বোঝেন না। হোমিওপ্যাথি এতটা সংকীর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। আমাদের পুরো মানুষটিকে জানতে হয়। না হলে এ্যালোপ্যাথিক বিশেষজ্ঞের মত রোগ আরোগ্যের নামে রোগদমনই হয়। বিশেষজ্ঞরা আগে চিকিৎসা দিতেন উচ্চরক্তচাপ, ডায়বেটিস, হাঁপানী, হৃদরোগ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের জন্য আর এখন দেন এগুলো ম্যানেজ করার চিকিৎসা। তারা আরোগ্যের চিকিৎসা দেন না। আর তথাকথিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেন ঘুমের ওষুধ বা ক্ষেত্র বিশেষে কাউন্সেলিং।

ডা. বেনজীর বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *