ল্যাবরোটরিজ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাটা প্রকৃত পক্ষে খুব চ্যালেন্জিং। রোগের কারণ নির্ণয় করতে দক্ষ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন চিকিৎসক, আধুনিক হাসপাতাল-ক্লিনিক, অত্যাধুনিক মেডিক্যাল সরন্জামাদি সকল কিছুর দ্বারা সর্ব্বোচ্চ চেষ্টাও করা হয় । প্রতিটি ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে চিহ্নিত করা হয় এবং তার কোন না কোন নাম দেয়া হয়। এত প্রচেষ্টার পরও ঐ রোগটি আসলে কি এবং রোগীই বা কে তা অজানাই থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, রোগ নির্ণয়ের নামে প্রতিটি ক্ষেত্রে এক একটি লেবেল দেয়ার চেষ্টা করা হয়।
ল্যাবেরটরিতে শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়, রোগ নির্ধারণ করা হয় এবং এর পর রোগকে ধ্বংস করতে শক্তিশালী ষ্টেরয়েড, কর্টিজন, এন্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক ইত্যাদি ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। চিকিৎসার আগে-পরে এক্সরে ও অন্যান্য ডায়াগনস্টিক টেস্ট রিপোর্টের মধ্যে পারস্পারিক তুলনা করা হয় এবং ঐ সকল বিজ্ঞানিক তথ্যাদি ব্যবহারের উপর নির্ভর করে রোগ চিকিৎসার সর্বশেষ ফলাফল একটি সম্পর্কে চুড়ান্ত মন্তব্য করা হয়। যে রোগীর পায়ের অস্থিতে টিউমার হয়েছে তার অস্থিটি কর্তন করা হয়। কয়েকবারের ফলোআপ চিকিৎসার পর এবং অবশ্যই হরেক রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগী রোগমুক্ত হয়েছে বা আরোগ্য লাভ করেছে মর্মে ঘোষণা করা হয়। যে রোগী ২০ বছর যাবত কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগেছন এবং নিয়মিতই ডাক্তারের চিকিৎসা নিয়ে আসছেন তার অভিযোগ ”আমি কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছি”। তাকে প্রতিবারই জোলাপ বা রেচক জাতীয় ঔষধ বা কোষ্ঠ পরিষ্কার করে এমন কোন ঔষধ সেবন করানো হচ্ছে। তার রোগ লক্ষণাদি প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতির ভাষা – যা রোগের গতিশীল সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ। রোগী কেন বলেনা যে ”আমার অন্ত্র বা অভ্যন্তরপ্রদেশের কোষ্ঠকাঠিন্য” বরং সে বলে ”আমি কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত”। কিন্তু দুঃখের বিষয় রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মানসিক ও আবেগ সম্পৃক্ত বিষয়সমূহ সর্বদাই অগ্রাহ্য করা হচ্ছে।
একজন রোগী চিকিৎসা গ্রহণের লক্ষ্যে ডাক্তারের নিকট যায় এবং বলে ”আমি অসুস্থ”, ”আমি ভালবোধ করছি না”। তখনই জেনারেল ফিজিশিয়ান অথবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শুরু করেন একটির পর একটি মেডিক্যাল পরীক্ষা। উদ্দেশ্য রোগ নির্ণয়। তারা রোগীকে নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন। চিন্তিত রোগীর রোগ নিয়ে যা তাদের ভাষায় শুধু শারীরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তাই তারা অবশ্য পুঙ্খানুপুঙ্খুরূপে রোগীর শরীরটি অধ্যয়ন করেন। তারা যদি শেষ পর্যন্ত কোন কিছু খুঁজে পেতে সমর্থ না হন তবে রোগটিকে মনোদৈহিক লেবেল লাগিয়ে দেবেন এবং রোগীকে মনোস্তাত্তিক বা মানসিক রোগের চিকিৎসকের নিকট পাঠিয়ে দেবেন। আর এটি তখনই ঘটে যখন রোগীর সকল পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক রেঞ্জের মধ্যে থাকে। কোন কিছু নরমাল রেঞ্জ অতিক্রম না করলে তারা রোগের কোন নামকরণ করতে অপারগ। অথচ রোগী সকল সময়েই কোন না কোন কষ্ট-যন্ত্রণা নিয়েই তো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে থাকে। কষ্ট-যন্ত্রণা-ভাল না লাগার যে অনুভূতি তাকে যন্ত্র দিয়ে কিভাবে নির্ণয় করা যাবে? তার তো কোন ওজন-আকৃইত নেই, নেই কোন রং। কষ্ট-যন্ত্রণাতো কেবলই অনুভূতি। রোগী বা তাকে যিনি দেখাশুনা করেন তার কাছ থেকেই এর একটি জীবন্ত চিত্র পাওয়া সম্ভব। ব্যাক্টেরিয়া-ভাইরাস সবক্ষেত্রে এই কষ্টের কারণ নয় যে তা যন্ত্রে ধরা দেবে।
এখানে লক্ষণীয়, যদি শারীরিক স্তরে কিছু পাওয়া যায় তবে সরাসরি একটি রোগের নাম দেয়া হয়। ফলতঃ আমাদের শারীরিক সত্তা খুব শীঘ্রই একটি পৃথক পরিচয় অর্জন করে যাকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে গণ্য করা হয় – যেন শরীরের নিজেরই ক্ষমতা রয়েছে তাকে রোগাক্রান্ত করার বা তাকে বা সুস্থ রাখার। কি আশ্চর্য!
দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত একটি গাড়ীকে যেভাবে গ্যারেজে নিয়ে মেরামতের চেষ্টা করা হয় একজন রোগীকেও সেভাবে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয় হাসপাতাল-ক্লিনিকে নিয়ে। কিন্তু এভাবে বিধ্বস্ত/রুগ্ন একজন মানুষকে কখনও স্বাস্থ্যে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। অপ্রয়োজনীয় মনে করে হাসপাতালে রোগীর কিছু অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হতে পারে, কিছু অঙ্গ সংযোজন/ বিয়োজন করা হতে পারে – শুধুমাত্র যদি ঐ পন্থা অবলম্বন করা হয় অর্থাৎ রোগীর শরীরেই রোগের অস্তিত্ব খোঁজা হয়। কি চমৎকার, মহান এবং সহজ চিকিৎসা ব্যবস্থা!!
শুধুমাত্র রোগীর প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট বিবেচনা করলে আরোগ্য বিধান করা কখনও সম্ভব নয়। কারণ এতে সম্পূর্ণরূপে রোগটিকে চাপা দেয়া হয় যাকে ভুলবশতঃ আমরা আরোগ্য বলে থাকি। প্রকৃতপক্ষে রোগ তার স্থান পরিবর্তন করে। উদাহরণস্বরূপ ত্বকের রোগ স্থানান্তরিত হয় পেশীর রোগে, পেশীর রোগ রূপান্তরিত হয় অস্থির রোগে, আর ত্বক-পেশী-অস্থির রোগে যে জাতীয় চিকিৎসা দেয়া হয় তা অতি শীঘ্রই পরিণত হয় কিডনী-লিভার-ফুসফুস-হৃদযন্ত্র-মস্তিষ্কের রোগে। এটিই চিরন্তন নিয়ম। আক্রান্ত টিস্যু অপসারণ করে বা কেমোথেরাপী দিয়ে কখনও ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব নয়। ক্যান্সার নিজেই শরীরের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রকাশ পায় বা বিস্তার লাভ করে থাকে। অন্যান্য যেকোন রোগের মত ক্যান্সারও রোগীর শরীরে বাসা বাঁধার আগে তা গতিশীল মানবদেহের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে উপর আঘাত আনে। সৃষ্টি হয় অভ্যন্তরীন বিশৃঙ্খলা। যাকে যন্ত্র দিয়ে নির্ণয় অসম্ভব। অভ্যন্তরীণ এই বিশৃঙ্খলার নামই রোগ। মৃত শরীরের তো কোন কিছুতে এলার্জি নেই বা তাতে কোন রোগ সংক্রমণ বা ইনফেকশন হয়না। কারণ মৃত মানবদেহের কোন অনুভূতি নেই। মৃত মানবদেহ চিন্তা করতে অক্ষম, এর না আছে কোন ইচ্ছাশক্তি বা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতা। মানুষের মন তথা আত্মা প্রকৃতি থেকে সরাসরি সবকিছু আহরণ করে। এটি বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার একটি উপকরণ যার সাহায্য আমরা চিন্তা, অনুভূতির দ্বারা জীবনের সীমাহীন আনন্দকে উপভোগ করে থাকি। যখন আমাদের ইচ্ছাশক্তি নেতিবাচকভাবে আক্রান্ত হয় এবং আমরা ঠিক বা বেঠিক অথবা ভাল বা মন্দের মাঝে পার্থক্য করতে পারিনা জীবনের স্বচ্ছ বিষয়গুলো তখন ঝাপসা-ভোতা-অস্বচ্ছ হয়ে যায়। মানুষ তখন নিজেদের অবহেলা করতে শুরু করে, শুরু করে নিয়ম লঙ্ঘন করতে, তাদের মধ্যে কাজ করে গোপন করার প্রবণতা, তারা মিথ্যা বলে, নিজেকে লুকিয়ে রাখে এবং নিজেদের সাথে করে বিশ্বাসঘাতকতা। তারা সত্যকে গোপন করার চেষ্টা করে এবং শক্তিশালী ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের অগভীর বা সুপারফিজিয়্যাল ইমেজ ধরে রাখার বৃথা চেষ্টা করে। ফলতঃ তারা নিজেরাই হারিয়ে যায়। যখন কোন অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা দেয়, তখন অনেক শ্রমসাধ্যে তৈরী করা অনমনীয় দৈহিক কাঠামো, যা লোকেরা ধরে রাখার চেষ্টা করে তা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়ে।
এই উন্মাদ অথচ বাস্তব প্রক্রিয়ার মধ্যে টিকে থাকার জন্য, আমাদের জন্য মঙ্গলদায়ক বস্তুগত বিষয়াদির প্রয়োজন স্বীকার করার আগে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের ভাল-মন্দের জন্য আমরাই দায়ী। আর আমাদের ভাল-মন্দ বোঝার অনুভূতি-ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। আমরা আমাদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে আজ দু’টি চরম পন্থা অবলম্বন করছি। একদিকে আমরা আমাদের আত্মার তথা জীবনের সত্যিকার আনন্দকে অস্বীকার করছি- তাই ভ্রান্তির মাঝে খুঁজছি নিবিড় আনন্দ আর শান্তি। অন্যদিকে অন্ধভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব তথা দেহের প্রতি অন্ধ ভালাবাসা এবং এর যত্নের জন্য নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিচ্ছি। আমরা নিজেরাই আমাদের মনকে অবরুদ্ধ করে রেখেছি। আমাদের চলার পথে মনের কোন ভূমিকাই যেন নেই। আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করার সময় পাইনা ”তুমি কে? তোমার উৎস কি? তুমি কোথা হতে এলে? তোমার গন্তব্য কোথায়? তোমার বাস্তবতা কি? গন্তব্যে পৌঁছাতে তোমার ভূমিকা কি? তোমার নিজের এবং নিজের শরীরের প্রতি দায়িত্বই বা কি?”
সৃষ্টিকর্তা আমাদের এক আশ্চর্যজনক জীবন দান করেছেন। এটি প্রস্তুত, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আত্মা একটি সুন্দর স্থানে বাস করে তার যত্ন নেয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। আর তা করলেই আমরা আমাদের জীবনকে সুখী-সমৃদ্ধ করতে পারি। পারি নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে আমরা কি চাই সে বিষয়ে।
সকল সৃষ্টজীবের মধ্যে মানুষকেই কেবল দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে জটিলভাবে তৈরী করা হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই বাইনারী বা দ্বৈত পরিচয়ের অনেক প্রমাণ আছে। আমাদের অসুস্থতা প্রকাশের ধরণটিকেও এটি প্রভাবিত করে। একজন রোগী বলতে পারেন – ”আমার মাথাব্যথা আছে, আমার পা ভারী বোধ হয় কিন্তু আমি নিজেকে শান্ত ও সুখী মনে করি।” ”আমি মিষ্টি জাতীয় খাবার পছন্দ করি কিন্তু আমার সেগুলি হজম হয়না।” ”আমার কোষ্ঠকাঠিন্য আছে”। ”আমার ঘাড় শক্ত বোধ হয়, আমি হতবুদ্ধি বোধ করি”।
আমরা আবারও ”আমি” এবং ”আমার” শব্দ দু’টি ব্যবহার করি। আমরা আমাদের দৈহিক সত্ত্বাকে স্পর্শ করতে পারি, স্পর্শ করে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি। কিন্তু আমরা সবাই সতেচন যে, আমরা এই ”আমি” কে কখনও স্পর্শ করতে পারিনা। বা স্পর্শ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারিনা। এর কাছে আসার বা একে স্পর্শ করার একমাত্র উপায় হলো- একটি বন্ধুত্বপূর্ণ শব্দের মাধ্যমে বা কিছু শুভেচ্ছাসূচক চিহ্নের দ্বারা। এটি জীবনের গতিশীল অস্তিত্বকে নির্দেশ করে যা কখনও এক্সরে বা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা সনাক্ত করা সম্ভব নয়। আত্মার অস্তিত্বকে অনুভব বা স্পর্শ করা যায় কেবল অন্য একটি আত্মার দ্বারা। আর আত্মার কল্যাণ চাওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই।
উদাহরণস্বরূপ, হাসপাতালে একজন মরণাপন্ন রোগী আছেন যিনি অসহ্য ব্যথা ও যন্ত্রণা ভোগ করছেন। কোন ঔষধই তার ব্যথা-কষ্ট উপশম করতে পারছেনা। তার আত্মীয় স্বজনেরা অসহায় বোধ করছেন এবং একমাত্র এই প্রার্থনাই করছেন যে একমাত্র মৃত্যুই তার যন্ত্রণা লাঘব করবে। আর তাই তারা তার আশু মৃত্যু কামনা করছেন। এমন দৃশ্য আমরা প্রায়শঃ দেখি। প্রতিনিয়ত রোগীর যন্ত্রণা বেড়েই চলে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না এমন কেউ তাকে দেখতে আসে, সে এমন কেউ যে তার খুব কাছের, যে তাকে বুঝতে পারে, ভালবাসে। তার এই ভালবাসার বা পছন্দের মানুষটির সাক্ষাতের সাথে সাথেই রোগীর সকল রোগযন্ত্রণার অবসান হয় এবং রোগীটি শেষ যাত্রা পথের দিকে অগ্রসর হয় অর্থাৎ হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। তখন তার আর কোন ব্যথা-কষ্ট নেই কারণ সে তখন মুক্ত।
এটি বিশ্বাস করা বা না করার কোন প্রশ্ন নয়। এটি হলো বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণের বিষয়। মানবপ্রকৃতির এই দ্বৈত সত্ত্বা যদি সত্য হয় তবে তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশের জন্য আমাদের দুটি ভিন্ন শব্দের দরকার নেই। এবং যদি এটা সত্য হয় যে, ”আমি” আমার শরীরকে বহন করি যেভাবে ”আমার” পরিচয় হিসেবে – তাহলে কেন আমার রোগের কারণ শুধু দৈহিক স্তরে খুঁজি? মন বা আত্মায় কেন খুঁজিনা?

ডা. বেনজীর আহমেদ একজন কনসাল্টেন্ট হোমিওপ্যাথ। বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.