এটা অত্যন্ত হতাশাজনক যে অধিকাংশ স্বাস্থ্য পেশাজীবি আরোগ্য বলতে কি বুঝায় তা জানেন না। কিন্তু চিকিৎসক ও রোগীর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেবল বিরক্তিকর বা উত্তেজক রোগলক্ষণ (bothersome or irritable symptoms) দূরীকরণের নাম আরোগ্য (Cure) নয়। আরোগ্যের অর্থ হচ্ছে রোগভোগের পূর্বের স্বাস্থ্যে ফিরে যাওয়া। পূর্বের স্বাস্থ্যে পূর্ণ প্রত্যাবর্তনের নামই আরোগ্য। চিকিৎসার পরও যদি রোগী পূর্বের রুগ্নাবস্থায় ফিরে যায় তবে বুঝতে হবে সফল আরোগ্যলাভ হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় – চিকিৎসার পরও রোগীর মাইগ্রেণের ব্যথা যদি বার বার ফিরে আসে তবে মাইগ্রেণ আরোগ্য হয়নি। ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রেও একই কথা – যদি লক্ষণাবলী চিকিৎসার পর দূরীভূত হয় কিন্তু রোগীর খাবারে অরুচি হয় এবং নিয়মমত ঘুমাতে না পারে বা অনিদ্রা দেখা দেয় তবে তাকে আরোগ্য বলে না।  একই ভাবে যদি কোন রোগীর যদি পাকস্থলীর ইনফেকশন দেখা দেয় এবং তার চিকিৎসার পর যদি পেটের পেশিসমূহের বেদনাদায়ক ও সংকুচিত চাপ অনুভব করে বা হজমপ্রক্রিয়ার গন্ডগোল থেকে যায় সেটাও আরোগ্য নয়। এক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষা করে যদি স্বাভাবিক রিপোর্ট পাওয়াও যায়, তবুও বলতে হবে আরোগ্য সাধিত হয়নি। কারণ রোগী পূর্বের স্বাস্থ্য প্রত্যাবর্তন করেনি।

রোগলক্ষণের সাময়িক অনুপস্থিতি বা সামান্য উন্নয়ন বা রোগলক্ষণ চাঁপা দেয়াকে ডাক্তার ভুলবশতঃ আরোগ্য বলতে পারেন। কোন কোন ক্ষেত্রে রোগলক্ষণের সাময়িক উপশমদান চিকিৎসা লক্ষ্য হতে পারে যেখানে রোগীর অবস্থা সত্যিই বিপদজনক বা রোগী নিরাময়যোগ্য নয় বা অত্যন্ত জটিল রোগী। তথাপি রোগলক্ষণ চাঁপা দেয়ার নামে এই সাময়িক উপশমের অর্থ হচ্ছে আগুনে পেট্রোল ঢেলে দেয়া। প্রাথমিক উপশম দেখে রোগী খুশী হতে পারে কারণ তার কষ্টাবলী কিছু সময়ের জন্য দুর হয়েছে। কিন্তু কিছুসময় পরে রোগী তার অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নতুন সমস্যার আবির্ভাব দেখতে পান। উদাহরণ হিসেবে একটি সাইনুসাইটিসের রোগীর কথা বলা যাক। রোগী চিকিৎসার পরে সাইনাসের আর কোনপ্রকার কষ্ট বা বিশৃংখলা নাও দেখতে পারে। কিন্তু রোগলক্ষণ চাঁপা দেয়ার কারণে তার নিম্নাঙ্গ বা পায়ের পাতা ফুলে যেতে পারে। অথবা ধরুন একজন আথ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীর কথা, চিকিৎসায় যার সন্ধির ব্যথা সাময়িকভাবে নাও থাকতে পারে, কিন্তু ঐ রোগী উচ্চ রক্তচাপে ভোগা শুরু করতে পারে। অথবা ধরুন একজন মহিলার কথা যিনি প্রচন্ড অবসাদে ভুগছেন। জীবনের আনন্দ হারিয়ে ফেলেছেন বা আর আগের মত উপভোগ করছেন না। আর এ ঘটনার সূত্রপাত যদি হয়ে থাকে তার আদরের কন্যার উচ্চশিক্ষার্থে অষ্ট্রেলিয়া যাবার পর থেকে। সেক্ষেত্রে, তার উদ্বেগ, দুঃচিন্তা ঐ পর্যায়ে প্রথম বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে তার গতিশীল জীবনীশক্তিতে। ফলতঃ তিনি চিন্তার সাগরে ভাসতে থাকেন আর ভুগতে থাকেন নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায়। এভাবে একসময় তার স্তনে টিউমারজাতীয় কিছুর অস্তিস্ব অনুভব করেন। অত্যাধুনিক যন্ত্রে পরীক্ষার পর আবিষ্কৃত হলো তার মরণব্যাধি ক্যানসার হয়েছে। ডাক্তার কালবিলম্ব না করে তার স্তন অপসারণ করলেন এবং কেমোথেরাপি চালিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি এ যাত্রায় আরোগ্য লাভ করে পার পেয়ে গেলেন বলে ডাক্তার চালিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি এখন তার মেয়েকে নিয়ে অধিকতর উদ্বেগ-দুঃচিন্তায় ভুগে যাচ্ছেন, ডাক্তার যার খবরই রাখেননি। রোগের মূল কারণটি এখনও বিপদজ্জনকভাবে বিদ্যমান। তার ক্যান্সার আসলে কিছুই নয়, বরং সেটা হচ্ছে তার গভীর বিষাদের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বৃক্ষের একটি কুৎসিত রোগাক্রান্ত ফলকে অপসারণ করে যেভাবে বৃক্ষটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায়না ঠিক তেমনি, এই ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীটিকে স্তন অপসারণের মাধ্যমেও বাঁচিয়ে রাখা যায়না। অতি অল্প সময়ের মধ্যে রোগীনির ওভারীতে সিস্ট দেখা গেল এবং এক্ষেত্রেও কোন ঝুঁকিতে না গিয়ে ডাক্তার অতিদ্রুত সিস্ট কেটে ফেললেন। এরপর রোগীনি শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হতে শুরু করলেন, তারপর পলি আথ্রাইটিস …। সবশেষে মারাত্মক রক্তক্ষরণে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন। একেই কি আরোগ্য বলা হবে?

হোমিওপ্যাথির জনক ডাঃ হ্যানিম্যান আমাদের শিখিয়েছেন যে রোগের উৎপত্তি হচ্ছে গতিশীল জীবনীশক্তির বিশৃংখলার মধ্যে। জীবনীশক্তি যেখানে আপোস করতে বাধ্য হয় সেখানেই বিশৃংখলা দেখা দেয়। রোগ বা অসুস্থতা প্রকৃতপক্ষে জীবনী শক্তি বা প্রাণশক্তির এক দুর্বল এবং বিশৃংখল অবস্থার নাম। প্রাকৃতিক নীতি অনুযায়ী সঠিক হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করা গেলে এবং তার মাধ্যমে জীবনীশক্তিকে পূর্বের সাম্যাবস্থায় উজ্জীবিত করা গেলে প্রকৃত আরোগ্য সম্ভব হতো। ফলতঃ রোগী স্থায়ী আরোগ্যের সন্ধান পেতেন এবং পুনঃপুনঃ রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা রোধ হতো।

ডা. বেনজীর আহমেদ একজন কনসাল্টেন্ট হোমিওপ্যাথ। বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *