রোগের গতিবিধির পূর্বাভাস ও আরোগ্য সম্ভাবণা (Prognosis)ঃ ডাক্তার হিসেবে রোগীর যে দু’টি প্রশ্ন প্রায়ই শুনতে হয় তা হচ্ছে – (১) আমার রোগটি আদৌ সারবে কিনা এবং (২) রোগ সারতে কতদিন লাগবে। এজাতীয় প্রশ্ন মোকাবেলায় কিছু আধুনিক মেডিকেল ডক্টর কিংবা হোমিওপ্যাথ বা ভেষজ চিকিৎসক নানারকম চতুরতার আশ্রয় নেন। কেউ বলছেন ৩ হতে ৬ মাসের প্যাকেজ, কেউ বলছেন ৩ ফাইলে পূর্ণ কোর্স তবে ৪ ফাইল খাওয়া ভাল। কেউবা দিচ্ছেন ১০০% গ্যারান্টি, আবার কেউবা বলছেন – বিফলে মূল্য ফেরত। এগুলির কোনটিই কাম্য নয়। ডাক্তার আরোগ্যের নামে রোগদমন নিয়ে ভাবেন; রোগীর কি হবে তা নিয়ে একবারও ভাবেন না।

হোমিওপ্যাথিতে একিউট রোগী কয়েক ঘন্টা বা খুব জটিল হলে ২/৩ দিনের মধ্যে আরোগ্য হয়। কিন্তু ক্রণিক রোগীর প্রতি ১ বছর রোগভোগের জন্য নিরাময়ে মোটামুটি ১ মাস সময় লাগে। অন্য কোন চিকিৎসা ব্যবস্থায় ক্রণিক রোগী আরোগ্য তো হয়ই না বরং একটির পর একটি নতুন উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। এ্যালোপ্যাথিতে ডায়বেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যন্সার, হাঁপানী এরকম হাজারো অন্যারোগ্য রোগ রয়েছে যার তালিকা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একজন সৎ, দক্ষ ও সুশিক্ষিত হোমিওপ্যাথ রোগীর যাবতীয় শারীরিক, আবেগিক ও মানসিক লক্ষণাদি সংগ্রহ করে রোগীলিপি তৈরী করেন। বলা হয় এটি যথার্থ ভাবে করতে পারার অর্থ ৫০% সাফল্য। কিন্তু বলা যত সহজ করা ততোটা কঠিন। যাহোক, এরপর হোমিওপ্যাথ গভীরভাবে কেসটি অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করে রোগীর জন্য একটি চিকিৎসা পরিকল্পনা (treatment plan) তৈরী করেন । রোগীর রোগের গতিবিধি সম্পর্কে হোমিওপ্যাথ একটি তথ্যভিত্তিক ও যৌক্তিক ভবিষ্যতবাণী বা ভাবীফল বা পূর্বাভাস (Prognosis) তৈরী করেন। এর মধ্যেই ইংগিত থাকে রোগটি মোটামুটি কতটা গভীর বা জটিল (complex), আরোগ্যে কত সময় লাগতে পারে, আদৌ আরোগ্যযোগ্য (curable) নাকি শুধু উপশমযোগ্য (palliative), আরোগ্যের সীমা ছাড়িয়েছে (incurable) কিনা ইত্যাদি। নিম্নোক্ত বিষয়ের উপর এই পূর্বাভাস নির্ভরশীল। যেমনঃ

  1. চিকিৎসা গ্রহণের সময় রোগীর রোগের জটিলতা বা গভীরতাঃ রোগটি যত জটিল বা গভীর আরোগ্যলাভে ততো অধিক সময় লাগবে।বিষয়টি রোগীর শারীরিক-আবেগিক-মানসিক স্তরে নানা নির্দেশকের উপর নির্ভর করে। আবার একই স্তরের মধ্যে রোগের গভীরতা অনুযায়ী ভাবীফল ভাল বা মন্দ হয়। যেমন- দৈহিক স্তরে হৃদরোগীর আরোগ্যের সম্ভাবণা চর্মরোগী হতে কম।

  2. প্যাথলজির প্রকৃতি ও অভিযোগের গভীরতাঃ প্যাথলজি যত জটিল, ভাবীফল ততো মন্দ। আর ৩টি স্তরেই তার কিছু না কিছু প্যাথলজি থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যদিও মানসিক স্তরটি অত্যন্ত গভীর তবুও শারীরিক স্তরে ”ক্যান্সার” অবশ্যই মানসিক স্তরে ”মনোযোগের অভাবের” চেয়ে অধিক মন্দ পূর্বাভাসযুক্ত। উল্লেখ্য- শারীরিক, আবেগিক ও মানসিক প্রতিটি স্তরে লক্ষণসমূহের গুরুত্বানুসারে পৃথক অনুক্রম (hierarchy of symptom) রয়েছে।

  3. স্বাস্থ্যের স্তর বা লেভেলঃ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস রোগীকে ১২টি স্তরে ভাগ করেছেন। যার লেভেল যত উপরের দিকে তার আরোগ্যপ্রবণতা ততো ভাল। ১ নং লেভেলে ক্যান্সারও আরোগ্য হয়। আবার ১২ নং লেভেলে নিউমোনিয়া আরোগ্য করাটাও কঠিন হয়ে দাড়ায়।

  4. রোগের কারণঃ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর অন্তর্গত হলো – বংশগত রোগপ্রবণতা (genetic predisposition), বিশৃংখল জীবনযাত্রা প্রণালী (undisciplined life style), শারীরিক, মানসিক, আবেগিক স্তরে কোন প্রকার আঘাত (trauma), দমনমূলক চিকিৎসা (suppressible treatment), টীকাদান (vaccination) ইত্যাদি। এছাড়া, একিউট ইনফেকশনজনিত রোগ জীবনী শক্তিকে ব্লক করা সহ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system) কে দুর্বল করে দিতে পারে। এর একটিমাত্র ফ্যাক্টরই আরোগ্য সম্ভাবণাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে যথেষ্ট। কিন্তু এরকম একাধিক ফ্যাক্টর থাকলে রোগীর আরোগ্য অধিক সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।

  5. অতিরিক্ত সংবেদনশীলতাঃ কিছু বিষয়ের প্রতি কিছু মানুষের মাত্রাতিরিক্ত সংবেদনশীলতা থাকে যেমন- নির্দিষ্ট পরিবেশ, গন্ধ, খাদ্য, নির্দিষ্ট দ্রব্যাদিতে এ্যালার্জি, সামান্য কারণে মানসিক ও আবেগিক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো ইত্যাদি আরোগ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

  6. মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাঃ যারা স্বার্থপরতার জন্য স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক হতে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন, সমাজের কোন কাজে লাগছেন না, তাদের চেয়ে যারা সামাজিক, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন তাদের আরোগ্য অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়।

  7. নির্বাচিত ওষুধের স্বচ্ছতাঃ রোগীর লক্ষণাবলী ওষুধের লক্ষণাবলীর সাথে যতোটা সাদৃশ্যপূর্ণ হয়, আরোগ্য ততো দ্রুত সাধিত হয়। এটা প্রমাণ করে যে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও কিছুটা সুশৃংখল পদ্ধতিতে কাজ করছে এবং রোগলক্ষণ পূর্ণরূপে চাপা পড়েনি।

উপরোক্ত সামগ্রিক বিষয়াবলীর উপর নির্ভর করে রোগী আরোগ্যে কত সময় লাগবে তা নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া এর মাধ্যমে রোগের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কেও একটা ধারণা পাওয়া যায়। তাই বিয়গুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা উচিত নয়।

সবশেষে, একটি নিগূঢ় সত্য এই যে, আমরা তাত্ত্বিকভাবে যতই যুক্তিযুক্ত পূর্বাভাস বা প্রগনসিস তৈরী করিনা কেন রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল মূল্যায়ন করা যায় ওষুধ প্রয়োগের পর তার প্রতিক্রিয়া দেখে। এজন্য রোগীকে সদৃশতম ওষুধ সঠিক শক্তি ও মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। আর সঠিক রোগীলিপি প্রনয়ণই এ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।

ডা. বেনজীর বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *