আজকের লেখাটি তাদের জন্য যারা অধিকাংশ সময় বসে কাজ করেন (desk work)। এরা sedentary lifestyle এর অধিকারী। ইদানিং জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে ”Sitting is the new smoking”। সর্বশেষ গবেষণা বলছে যে, যেসকল কর্মজীবিরা দিনের বেশীরভার সময় বসে কাটান তাদের ওজন বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। আপনি যদি জীবনের এই ক্ষুদ্র বিষয়টিতে পরিবর্তন আনতে পারেন তা অবিলম্বে আপনার স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি হচ্ছে: ”Sit less ”। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাসটি ধুমপানের সমপর্যায়ের ক্ষতি করে।

সু্স্বাস্থ্য হচ্ছে সফল ও উৎপাদনশীল জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি। প্রিয় নবী মুহম্মদ (সাঃ) বলতেন, Whosoever begins the day feeling family security and good health and possessing provision for his day is as though he possessed the whole world.” [Tirmidhi]

সাম্প্রতিক সময়ে আসীন সময় বা sedentary time এর উপর পরিচালিত ৪১টি গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা গেছে টাইপ-২ ডায়বেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যারা সবচেয়ে সক্রিয় (most active) তাদের চেয়ে ৯১% বেশী। ২০১৩ সালে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে সকল ব্যক্তি দিনে ৪ ঘন্টা বা তার বেশী বসে কাটান তাদের ক্যান্সার, ডায়বেটিস, হৃদরোগ হবার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে তাদের চেয়ে বেশী যারা এর চেয়ে কম সময় বসে কাটান।

সত্যিকার বিশ্বাসী হিসেবে এই গবেষণা গুলি ২টি কারণে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

  1. আমাদের শরীরকে কিছু সময়ের জন্য আল্লাহ আমাদের অধীনে ন্যস্ত করেছেন। সুতরাং শরীরের যত্ন নেওয়াটা আমাদের দ্বীনের-ধর্মের অংশ।

  2. মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে প্রয়োজন প্রো-এ্যাকটিভ থাকা এবং এ ব্যাপারে আমাদের উৎসাহিত করা হয়েছে।

এখন যদি আপনি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ক্ষতিটি পোষাবার জন্য কিছুক্ষণ ব্যায়ামাগার বা জীমে কাটান, সেটা ততোটা কাজ করবে না। কারণ, গবেষণা বলছে এধরণের কাউন্টার এ্যাকশন বা জীমে কিছুক্ষণ ব্যায়াম করে ৮/১০ ঘন্টা বা ততোধিক সময় বসে থাকার ক্ষতিকে রোধ করা যায়না।

আপনারা প্রশ্ন করবেন – তাহলে সমাধান কি?

সমাধান হচ্ছে – সময় ও সুযোগ খুঁজুন দাড়ানোর জন্য। সুযোগ পেলেই দাড়িয়ে থাকুন। দাড়ানো অনেকভাবে আপনাকে সাহায্য করবে যেমনঃ

  1. দাড়ানো অবস্থায় অধিক ক্যালরী বার্ণ হয়। এটি শরীরের অবাঞ্চিত চর্বি কমাতে সাহায্য করে। না বসে ১ ঘন্টা দাড়িয়ে থাকলে ৫০ ক্যালরী বার্ণ হয়। দৈনিক ৪ ঘন্টা দাড়িয়ে থাকলে দিনে ২০০ ক্যালরী এবং মাসে ৬০০০ ক্যালরী বার্ণ হবে, যাতে প্রকারন্তরে শরীরের ১ কিলোগ্রাম বা ২.২ পাউন্ড চর্বি কমে যাবে।

  2. দাড়িয়ে থাকলে বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত হয়। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে আমাদের বৃহত্তর মাংশপেশীগুলি নিশ্চল বা স্থিতিশীল থাকে এবং গ্লুকোজ ও চর্বি ঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত হয় না। এতে করে রক্তে সুগার, ট্রাইগ্লিসারাইড ও ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যায় যা ডায়াবেটিস, স্থুলতা ও হৃদরোগে আক্রান্ত হবার পথকে সুগম করে।

  3. দাড়িয়ে থাকলে মস্তিষ্ক ভাল কাজ করে। কগনিটিভ ফাংশন উন্নত হয়। সম্প্রতি টেক্সাসের A&M Health Science Centre এর School of Public Health জানিয়েছে যে সব ছাত্ররা অধিকাংশ সময় দাড়িয়ে কাজ করে তারা বসে কাজ করা ছাত্রদের চেয়ে কার্যকরভাবে সময়কে ম্যানেজ করতে সক্ষম, সহজে তথ্য মুখস্থ করতে পারে, পড়া বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে পারে, একাধিক ধাপে সমস্যার সমাধান করতে পারে, সুন্দরভাবে নিজের চিন্তাধারাকে লেখায় প্রকাশ করতে পারে।

  4. দাড়ানো মেজাজ ও জীবনীশক্তি উন্নত করে। আমেরিকার Minneapolis এর গবেষকরা ৭ সপ্তাহের একটি স্টাডিতে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন স্টান্ডিং ডেস্ক কর্মীদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় কিনা। তারা দেখেছেন যে দাড়িয়ে থাকা কর্মীরা অধিক এনার্জিটিক, সুখী ও ভাল মেজাজে থাকেন। তাদের ব্যাক পেইন ও নেক পেইন ৫৪% কমে যায়।  বসে কাজ করা শুরু করলে তা আবার আগের পর্যায়ে ফিরে যায়। সুতরাং দিনভর দাড়িয়ে থাকা বা সক্রিয় থাকা কটিরেখা (waistline) ও সাধারণ স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম।

একজন মুসলিমের জন্য ঈমানের পর পরম অগ্রাধিকার (utmost priority) হচ্ছে স্বাস্থ্য। আমাদের প্রিয় রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “Ask Allah for forgiveness and health, for after being granted certainty, one is given nothing better than health.” (Tirmidhi)

রাসুল (সাঃ) এখানেই থেমে যাননি। তিনি আমাদের উৎসাহিত করেছেন এমন শারীরিক ক্রিয়াকলাপ করতে যাতে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।

আত-তাবারানির একটি বিশুদ্ধ হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন, Any action which is void of the remembrance of Allah is either a distraction or heedlessness except for four actions: Walking from target to target, i.e. during archery practice, training a horse, playing with one’s family, and learning to swim.”

আশ্চর্যজনক হচ্ছে তিনি (সাঃ) এখানে যা কিছু উল্লেখ করেছেন তার সবটাই শারীরিক কর্মকান্ড যা মানুষের শারীরিক ও সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

সুতরাং শরীরের যত্নের নিয়ত নিয়ে যতটুকু সম্ভব দাড়ানোর বা সংক্রিয় থাকার চেষ্টা করবেন আপনি নিশ্চিতভাবে আল্লাহর নিকট তার পুরষ্কার পাবেন ইনশাল্লাহ।

অধিকক্ষণ দাড়িয়ে থাকার সহজ ও পরীক্ষিত এবং বাস্তবায়নযোগ্য কিছু কৌশল হলোঃ

  1. দাড়িয়ে কাজ করার জন্য একটি ডেস্ক যোগাড় করুন। আপনি সেল্ফ ইমপ্লয়েড হলে আপনার জন্য সবচেয়ে ভাল বিনিয়োগ হবে এটি। আপনি যদি অন্যের অধীনে কাজ করেন তবে বসকে বিষয়টি খুলে বলুন। তিনি এটিকে লুফে নেবেন। ৪-৫ হাজার টাকার মধ্যে এমন একটি ডেস্ক পেয়ে যাবেন।

  2. আপনাকে দাড়াতে সাহায্য করে এমন কিছু ট্রিগার দৃশ্যকল্প (trigger scenario) রাখুন। যেমন – ”যদি আমার ফোন বেজে ওঠে” বা ”কোরআন তেলাওয়াত বা বই পড়ার সময়” বা ”সকাল-সন্ধ্যার দোয়া পড়ার সময়” ইত্যাদি ক্ষেত্রে ”আমি উঠে দাড়াবো”। অথবা আপনার পছন্দমত বাক্য বেছে নিন। বাক্যটি আপনি মনে মনে বলুন, কয়েক সেকেন্ড ধরে ভিজুয়ালাইজ করুন সিনারিওটি। ইনশাল্লাহ্ কিছু প্রাকটিসে আপনার ফোন বাজলে আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে দাড়াবেন।

  3. সহকর্মী বা বসকে জানিয়ে দিন যে আপনি দাড়িয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। তাহলে যখন কোন মিটিং এ থাকবেন বা কোন লেকচার শুনবেন সব সময়ই আপনার এই অপশনটি থাকবে। জানিয়ে রাখলে সাধারণত কেউ এতে আপত্তি করবেন না।

  4. প্রতি ঘন্টায় ৫ মিনিট শারীরিক সক্রিয় থাকেন এমন কিছু করুন।

অষ্ট্রেলিয়ান গবেষকরা অধিকক্ষণ বসে থাকার ক্রণিক ক্ষতি রোধে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ৩টি গ্রুপে ভাগ করে একটি গবেষণা করেছেনঃ

গ্রুপ-এঃ ৯ ঘন্টা বসে থাকা গ্রুপ; যারা বাথরুম ও কফি ব্রেক ছাড়া বসে থাকেন।

গ্রুপ-বিঃ ৮ ঘন্টা ৩০ মিনিট বসেথাকা গ্রুপ; যারা দিনের অন্য সময় ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করেন এবং

গ্রুপ-সিঃ নিয়মিত একটিভিটি ব্রেক গ্রুপ; যারা প্রতি ৩০ মিনিটে ১ মি. ৪০ সেকেন্ড করে ৯ ঘন্টার কাজে সর্বমোট ১৮ বার ট্রেডমিলে হাটেন।

ফলাফলে দেখা যায় – গ্রুপ-সি বা রেগুলার একটিভিটি ব্রেক গ্রুপ সবচেয়ে সফলভাবে রক্তের গ্লুকোজ কমাতে পেরেছেন। এরা গ্রুপ-বি এর চেয়ে অনেক স্বাস্থ্যবান। গ্রুপ-বি দিনে মাত্র ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করে।

শেষকথা, আপনার স্বাস্থ্য খুব ভাল থাকবে যদি দিনব্যাপী অনেকবার ঘন ঘন ছোট ছোট বিরতিতে কিছুটা শরীরচর্চা বা হাটাহাটি করে নেন। এটি প্রতিদিন শুধু ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করে সারাদিন বসে থাকার চেয়ে উত্তম। যাদের অন্য শরীর চর্চার করা অসুবিধা তারা চেষ্টা করবেন প্রতি ৬০ মিনিট অন্তর ৫ মিনিট প্রানবন্ত হেটে (brisk walk) আসার। সুস্বাস্থ্যের জন্য সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০ মিনিট হাটার অভ্যাসটিও চালু রাখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *