রোগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার (defence mechanism) প্রকৃত অবস্থা তার গর্ভধারণকালীন (moment of conception) তার পিতা-মাতা তাদের স্বাস্থ্যের কোন লেভেলে বা স্তরে ছিলেন বা পিতা-মাতা কোন্ কোন্ রোগে কি প্রকার জটিলতা নিয়ে ভুগছিলেন তার উপর বহুলাংশে নির্ভর করে। পিতা-মাতা এমনকি পূর্ববর্তী বংশধরের প্রতিটি রোগই গর্ভধারণকালীন (during conception) সন্তানের মাধ্যে স্থানান্তরিত হয়। মজার ব্যাপার হলো বংশগত রোগপ্রবণতা (hereditary predisposition) হুবহু সন্তানের মধ্যে প্রবেশ করলেও তা সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করে। এটাই সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা। তিনি একের দায়ভার অন্যের উপর চাপান না। যাহোক, এই রোগগুলি যতই জটিল-গভীর হোক না হোক তা পরবর্তী বংশধরকে প্রভাবিত করবে না যদি না রোগীর ব্যক্তি জীবনে নিম্নোক্ত ২টি বিষয়ের অন্ততঃ একটি তাকে প্রভাবিত না করেঃ

১। দমনমূলক এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা বিশেষতঃ ভ্যাকসিনেশন বা টীকাদান, অধিকহারে এ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড, কর্টিজন, ট্রাংকুলাইজার ইত্যাদির ব্যবহার। অধিকন্তু, যে কোন এ্যালোপ্যাথিক ওষুধের বহুল ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার/অপব্যবহার বংশগত রোগটিকে সচল করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে, এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা প্রতিটি রোগকেই দমন করে এবং এই দমনকে চিকিৎসক ভুলবশতঃ আরোগ্য বলে থাকেন।

২। বিশৃংখল জীবনযাত্রা প্রণালী (imbalanced lifestyle) তথা খারাপ জীবনাচার রোগীর ভিতরে সুপ্ত থাকা বংশগত রোগকে উসকে দেয়। ভুল খাদ্যাভ্যাস, শরীর চর্চার অভাব, মাত্রারিক্ত শারীরিক-মানসিক পরিশ্রম, ধুমপান, মদ্যপান, জীবনব্যাপী শুধু বস্তুগত প্রাপ্তির (material gain) জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা, ধর্মহীনতা ইত্যাদি বিষয় বংশগত রোগপ্রবণতাকে জাগিয়ে তুলে রোগীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে।
একইভাবে কারো পিতা-মাতার স্বাস্থ্যও আমাদের বলে দেয় তার পূর্ববর্তী জেনারেশনের স্বাস্থ্যের লেভেল কেমন ছিল। তাই যে রোগীকে আমরা চিকিৎসা প্রদান করতে যাচ্ছি তার পূর্ববর্তী জেনারেশনের স্বাস্থ্যের লেভেলটি রোগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও তার সার্বিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে যা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসককে সহায়তা করে।

বংশগত রোগ প্রবণতার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রোগীর পিতা-মাতা উভয়পক্ষের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যে রোগ আছে তা হুবহু রোগীর মধ্যেও বিদ্যমান। অর্থাৎ বৃহত্তর পরিবারে পূর্বপুরুষের মধ্যে একই জাতীয় রোগের ইতিহাস থাকলে সংশ্লিষ্ট রোগী আরোগ্যে বিষয়গুলিকে বিবেচনায় আনতেই হবে। কারণ, এগুলি রোগীর জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীর কেসটি জটিল রূপ ধারণ করে বা আরোগ্যে অধিক সময় লাগে। তারপরও পূর্ববর্তী জেনারেশনের রোগভোগের ইতিহাস রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেয়।

বংশগত রোগপ্রবণতা যতটা বেশী, চিকিৎসাধীন রোগীর আরোগ্যের সম্ভাবণা ততোটাই ক্ষীণ বা সময়সাপেক্ষ। যে পরিবারে ভেতর যত বেশী ও গভীর মানসিক-আবেগিক ও শারীরিক গভীর ও গুরুতর প্যাথলজি থাকবে, রোগীর ছেলেবেলা হতেই অনেক দীর্ঘস্থায়ী ক্রণিক রোগ ও গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা যাবে, যা আরোগ্য করাটা কঠিন।

দুঃখের বিষয় পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও সন্তান প্রত্যাশি বাবা-মায়েরা পরবর্তী জেনারেশনের স্বাস্থ্য নিয়ে ততোটা সচেতন নন। আমাদের অবস্থা তো সবারই জানা। অথচ পিতা-মাতার উচিত সন্তান-সন্তুতি ও পরবর্তী জেনারেশনের স্বাস্থ্যের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি মনে করা ও সেমতে ব্যবস্থা নেয়া।

এখানে পিতা-মাতার ৩টি করণীয় রয়েছে। প্রথমত, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন জটিল-ক্রণিক রোগ থাকলে তা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যেমে পূর্ণ আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত সন্তান ধারণ বিলম্বিত করা। দ্বিতীয়ত, গর্ভাবস্থাই পরবর্তী জেনারেশনের চিকিৎসার সবচেয়ে ভাল সময়। তাই গর্ভবর্তী মাকে উপযুক্ত চিকিৎসা দিয়ে মা ও সন্তানের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা উচিত। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় এমন ব্যবস্থা আছে। তৃতীয়ত, সন্তান জন্মদানের পর তাকে অযথা টীকাদান, এ্যান্টিবায়োটিক, ষ্টেরয়েড, কর্টিজন ও সর্বোপরি সকলপ্রকার দমনমূলক (suppressive) এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা হতে দূরে রাখা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে অপ্রয়োজনে প্রতিটি স্বচ্ছল মাকে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উপায়ে সন্তান প্রসব করতে দেয়া হচ্ছেনা এবং ছোট-খাটো নানান অজুহাতে প্রসুতি মাকে ও তার নবজাতক সন্তানকে হাসপাতাল/ ক্লিনিকে থাকা অবস্থায়ই এজাতীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে দেদারসে।

প্রকৃতপক্ষে, এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীর রোগটি কম গুরুত্বপূর্ণ অংগ হতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ অংগে ভিন্ন নামে স্থানান্তরিত হয়। আর চিকিৎসকরা এতেই সন্তুষ্ট থাকেন। পরবর্তী জেনারেশনের স্বাস্থ্য নিয়ে কেউই ভাবছেন না।

হোমিও চিকিৎসায় বংশগত রোগ বা রোগপ্রবণতা আরোগ্য করা সবচেয়ে কঠিন তবে অসম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো – রোগী ও তার পূর্বপুরুষের সঠিক তথ্যপ্রাপ্তি। আমেরিকান সমাজে কোন কোন ক্লিনিকে/ হাসপাতালে রোগীর পিছনের ৭/৮ জেনারেশনের মেডিক্যাল হিস্ট্রি লিপিবদ্ধ আছে। আমাদের সমাজে রোগীরা নিজের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের দিতে পারেন না। তবে যেক্ষেত্রে রোগী বা তার পরিবার এসব তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করতে পারেন সেক্ষেত্রে ফলাফল ইতিবাচক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.