শারীরিক, আবেগিক, মানসিক আঘাত (physical, emotional, mental trauma) অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা শারীরিক আঘাতের জন্য হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। কিন্তু আবেগিক ও মানসিক আঘাতের দিকে ততোটা নজর দেননা। তারা বুঝতে পারেন না যে ভবিষ্যতে এই সমস্যাটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। অনেকে আবার এমনও আছেন যারা এক ধরণের দুঃখ বিলাসে ভোগেন, দুঃখকেই উপভোগ করেন। কেউ কেউ আবার মন বা ইমোশনাল লেভেলে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিকে ভুলতে পারেন না বা ভুলতে চানও না। কিন্তু তিনি নিজেই জানেন না যে এই আঘাত তার আবেগ ও মনোস্তরে কত গভীর ক্ষত তৈরী করতে পারে এবং তার জীবনকে বিপন্ন করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা শারীরিক নানা জটিল-ক্রণিক রোগের ক্ষেত্রেও মেন্টাল-ইমোশনাল আঘাতের প্রভাব দেখতে পাই। তাই এদিকে নজর দেয়াটা অত্যন্ত জরুরি।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে এধরণের ফিজিক্যাল-ইমোশনাল-মেন্টাল ট্রমা বা আঘাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, মেন্টাল-ইমোশনাল ট্রমার কারণে রোগী কোন জটিল-ক্রণিক রোগে আক্রান্ত হলেই তার সুচিকিৎসা প্রয়োজন। জটিল রোগ যেমন ডায়বেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, টিউমার-সিস্ট, বন্ধ্যাত্ব, হাঁপানী ইত্যাদিতে ভোগা রোগীর ক্ষেত্রেও গভীর অনুসন্ধানে কিছু মেন্টাল-ইমোশনাল কারণ দেখতে পাই।

আমাদের দেশে রোগীরা ডাক্তারের নিকট নিজ থেকে মেন্টাল-ইমোশনাল কোন বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে ইতস্তত করেন। কিন্তু মেডিক্যাল হিস্ট্রি জানার সময় এদিকে নজর দেয়া হোমিওপ্যাথের একান্ত দায়িত্ব। রোগীকে একথা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলা উচিত যে, তার ব্যক্তিগত কোন বিষয়ে ডাক্তারের কোনই আগ্রহ নেই। কিন্তু যদি এমন কোন বিষয় থেকে থাকে যা ঐ রোগীর রুগ্নতার কারণ – তবে তা জানতেই হবে। অনেক রোগী গোপনীয়তার আশ্বাস চান। নৈতিকার মানদন্ড অনুযায়ী যে কোন রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যাদি ডাক্তার গোপন রাখবেন এবং রোগীকে এ ব্যাপারে আশস্ত করবেন। কারণ, রোগীর জন্য ডাক্তারের একমাত্র বিবেচনা কিভাবে তাকে আরোগ্য করা যায়।

আমরা বিভিন্ন ধরণের ট্রমা বা আঘাতের মধ্যে পার্থক্য করি। উদাহরণ হিসেবে শারীরিক আঘাত, যেমন- মাথায় আঘাত বা ক্ষত, অন্য কোন প্রকার দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া, অংগহানি, আবেগিক ট্রমা যেমন- প্রিয়জনের মৃত্যু বা ডিভোর্স বা সেপারেশন, প্রেমে ব্যর্থতা এবং মানসিক ট্রমা যেমন – আত্ম পরিচয় সংকট বা self identity crisis বা আধ্যত্মিক ও ধর্মীয় হতাশা ইত্যাদি।

মেন্টাল-ইমোশনাল ক্ষেত্রে এধরণের ট্রমা একটি মানুষকে জীবনব্যাপী প্রভাবিত করতে পারে। এগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে এমনকি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করে থাকে। এর সন্ধান না পেলে দৈহিক রোগকেও আরোগ্য করা যায়না।

আজ এমন একজন রোগীর কথা লিখবো যিনি ১৫ বছর ধরে মারাত্মক রকমের শ্বাসকষ্টে ভুগতেন। প্রথম দিনে রোগীর রোগলক্ষণ লিপিবদ্ধ করার পর তার লক্ষণ সাদৃশ্যে একটি ওষুধ দেয়া হয়। রোগী সপ্তাহখানেক পর এসে হাজির হন এবং কোন উপকার না পাওয়ায় চরম ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করেন। যাহোক, বিস্তারিত জানতে চাইলে রোগী নিজেই এমন একটি বিষয়ের কথা উত্থাপন করেন যা তিনি তার স্বামী সাথে থাকায় প্রথম দিনে বলতে পারেন নি।

উল্লেখ্য হাঁপানীর জন্য সাধারণভাবে দায়ী এমন কোন কারণ ঐ রোগীর ছিলনা। যেমন – তিনি ছোট বেলায় সর্দি-কাশি-নিউমোনিয়ায় ভোগেননি। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে বা শিল্প এলাকায় বসবাস করেন না। রোগটি বংশগত কারণে হওয়ারও কোন ইতিহাস ও পাওয়া যায়নি। অতীতে তার চর্মরোগ দমন করা হয়নি। তারপরও অস্পষ্টভাবে প্রাপ্ত কিছু লক্ষণের উপর ভিত্তি করেই তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে রোগী তার আবেগের স্তরে একটি ট্রমা বা আঘাতের বিষয়টি একদম চেপে যান। যাহোক পরবর্তীতে রোগী নিজেই উপলব্ধি করেন যে আমার নিকট বিষয়টি খুলে বলা উচিত।

আমি তাকে গোপনীয়তার আশ্বাস দেয়ায় তিনি প্রথমে ১৫-২০ মিনিট ধরে কাঁদেন। ডাক্তার হিসেবে তাকে কাঁদতে দেয়াটা ঐ সময় আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়েছিল। আমি শিখেছিলাম যে, এজাতীয় রোগীকে সাত্বনা না দেয়াই উত্তম। কারণ, সাত্বনা অনেক সময় প্লাসিবোর কাজ করে যাতে পরবর্তীতে ডাক্তারের প্রতি রোগীর এক ধরণের ভক্তি, শ্রদ্ধা বা ভালবাসার উদ্রেক করে। ফলে রোগীর মধ্যে অনেক বিষয় গোপন করার বা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এটি প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের ৫ দশকের অভিজ্ঞতা। যাহোক আমি চেয়েছিলাম রোগী নিজে থেকেই স্বতস্ফূর্তভাবে কথা বলুক। আমাকে অবাক করে দিয়ে রোগী বললেনঃ

“I have been suffering from suffocation for the last 15 years”. অর্থাৎ ”আমি গত ১৫ বছর ধরে আমি একটি দমবন্ধ রোগে ভুগছি”।

আমার প্রথম প্রশ্ন – ঠিক কবে থেকে? তিনি উত্তর দিলেন – বাসর রাত হতে।

বিস্তারিত জানতে চাওয়ায় তিনি জানালেন – স্কুলে পড়াকালীন তার এক সহপাঠির সাথে তার গভীর প্রণয়ের কথা। সহপাঠিকে তিনি প্রচন্ড রকমের ভালবাসতেন। তাকেই নিয়ে ছিল তার স্বপ্ন, ভবিষ্যত পরিকল্পনা। যেকোন কিছুর বিনিময়ে তিনি তাকে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উভয় পরিবারের বাঁধার মুখে সে সম্পর্ক পরিণতিতে পৌছায়নি।

সেদিন আমার বিশ্লেষণে যেটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সেটি হচ্ছে – এই দমবন্ধ অবস্থা বা suffocation এর সূত্রপাত তার ইমোশনাল লেভেলে যা তার শারীরিক রোগ ”হাঁপানী”র জন্য দায়ী। প্রকৃত অর্থে তার ইমোশনাল লেভেলে একটি ব্লকেজের সৃষ্টি হয়েছিল যা থেকে তিনি মুক্ত হতে পারছিলেন না, আর তার পরিনতিই তার এ্যাজমা নামক রোগ হয়।

যে সকল লক্ষণের উপর ভিত্তি করে তার ২য় ওষুধটি দেয়া হয় সেগুলো হলোঃ

ailments from grief (দুঃখ/ বিষাদ হতে অসুখ)

ailments from disappointed love (প্রেমে হতাশ হয়ে অসুস্থতা)

sighing (দীর্ঘশ্বাস ফেলা)

weeping, tearful mood – cannot weep, though sad (কাঁদো কাঁদো মেজাজ, দুঃখবোধ সত্ত্বেও কাঁদতে না পারা)

silent grief (নিরব বিষাদ দুঃখ)

Respiration – asthmatic (শ্বাস- হাঁপানী রোগীর মত)

Generalities – food and drinks – fruits – aversion (ফলে অনিহা)

উল্লেখ্য তার অধিকাংশ লক্ষণ ছিল ইমোশনাল। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলো হাঁপানীর কোন সুস্পষ্ট লক্ষণ ও হ্রাস-বৃদ্ধি না পাওয়া গেলেও এই রোগীটি মাত্র দেড় মাসে পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন। এর পর এক বছরের অধিক তিনি ফলোআপে ছিলেন। রোগটি আর ফিরেনি।

উল্লেখ্য রোগী ইতিপূর্বে দেশে বিদেশে অনেক আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ গ্রহণ করলেও তাতে কোন ফল পাননি। ডাক্তারের পরামর্শে তিনি সর্বদা সাথে একাধিক ইনহেলার রাখতেন। ডাক্তার এটিকে অনারোগ্য হিসেবে ঘোষণা করে আজীবন ইনহেলার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন আসতে পারে রোগীর ইমোশনাল লক্ষণগুলির চিকিৎসা কিভাবে শারীরিক রোগটিকে (হাঁপানীকে) সারালো? রোগীর বক্তব্য – ”তিনি চিকিৎসা পেয়েই ঘোরের মধ্য থেকে বাস্তবতায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তার স্বামী তাকে প্রচন্ড ভালবাসতেন, না চাইতেই তিনি তার সকল চাহিদা পূর্ণ করেছেন। তার ২টি সন্তানের কথা ভাবেন। তিনি এটিও ভাবেন যে তার অতীত ভাবনার কোনই মূল্য এখন আর নেই। অতীতে ফেরা তার পক্ষে অসম্ভব। কারণ, তার প্রেমিকটি এতদিনে তার মতোই সংসার-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত। কোথায় যাবেন তিনি? বর্তমানে ফিরে আসাকেই তিনি যুক্তিযুক্ত মনে করেন। তার ১৫ বছরের ঘোর ও ভ্রান্তির অবসান হয়। এভাবেই মুক্তি পান দমবন্ধকরা পরিবেশ থেকে। চিকিৎসায় ইমোশনাল ব্লকেজ টি দুর হয় যা রোগীকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে এবং এ্যাজমাটি আরোগ্য হয় । কারণটি দূর হলে ফলাফলটিও দুর হবে। এটিই তো cause and effect relationship.

কি চমৎকার হোমিও চিকিৎসা! হোমিওপ্যাথের কাজ সঠিক ওষুধটি নির্বাচন করে প্রয়োগ করা। যার জন্য তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। আর ওষুধের কাজ রোগীর জন্য যেটি উত্তম, সেদিকে তাকে পরিচালিত করা – অর্থাৎ পরিপূর্ণ আরোগ্য সাধন করা। হয়তো সেদিন তার রোগের ইমোশনাল কারণটি জানা না গেলে হোমিওপ্যাথিতেও রোগটি অনারোগ্য থেকে যেতো।

Dr. Benojir is a consultant Homeopath and trained by the world’s best homeopath Prof. George Vithoulkas. To view the list of homeopaths worldwide trained by Prof. George Click here

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.