লেভেল অব হেলথ্ বা স্বাস্থ্যের স্তর এর প্রবক্তা বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস। তিনি তাঁর চিকিৎসা জীবনের ৫৫ বছরের গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে এই ধারণাটির অবতারণা করেন। রোগীরা মূলত ৪ টি গ্রুপে ১২ টি লেভেলে বিভক্ত। লেভেল অব হেলথ্ যার যত উপরে তার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ততোটা কার্যকর, ফলতঃ রোগী দ্রুত আরোগ্য হয়। যার লেভেল যত নিচে তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা ততোটা দুর্বল এবং আরোগ্যে সময় লাগে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দেয়ার পর রোগীর ক্ষেত্রে তার কি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয় সে পর্যবেক্ষণই এই ধারণার মূল ভিত্তি।

রোগী প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যের কোন লেভেলে আছেন তা বোঝার জন্য রোগীর ব্যক্তিগত মেডিক্যাল হিস্ট্রি (রোগ ও চিকিৎসার ইতিহাস) আমাদের সাহায্য করে থাকে। কে কোন লেভেলে আছেন তা নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হচ্ছে – রোগীর উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর (১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তদুর্দ্ধ) সহ কোন না কোন একিউট রোগ হওয়ার প্রবণতা। আর যখন রোগীর একিউট রোগ হয়না বা হওয়ার প্রবণতা হ্রাস পায় তখন বুঝতে হবে যে রোগীর গুরুত্বপূর্ণ অংগ যেমন মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড, ফুসফুস, যকৃত, কিডনী কোন না কোনভাবে আক্রান্ত। লেভেল অব হেলথ্ এর বিবরণ ও গুরুত্ব সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হলো।

গ্রুপ এ (লেভেল ১-৩)ঃ রোগীদের প্রতি ১-৩ বছরের মধ্যে উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর সহ যে কোন একিউট রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে এবং তা দ্রুত আরোগ্যও হয়।

গ্রুপ বি (লেভেল ৪-৬)ঃ রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতে শুরু করে। ফলে বছরে কয়েকবার এমনকি কারো কারো ক্ষেত্রে প্রায় প্রতি মাসেই নিম্ন তাপমাত্রার জ্বরসহ কোন না কোন একিউট রোগ দেখা দেয়। স্বাস্থ্য দিন দিন ভেংগে পড়ে।

গ্রুপ সি (লেভেল ৭-৯)ঃ রোগীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা রোগশক্তির সাথে আপস-রফা করতে শুরু করেছে। ফলতঃ এ জাতীয় রোগীর আর উচ্চজ্বর সহ একিউট রোগ দেখা যায়না বিশেষতঃ লেভের ৭ এর পর। কারণ লেভেল ৭ এ মাঝে মধ্যে অতি নিম্ন তাপমাত্রার জ্বরসহ একিউট রোগ হতে দেখা যায়। এরপর রোগীদের আর একিউট রোগ প্রবণতাই থাকেনা। বিশেষতঃ ৮ ও ৯ লেভেলে এমনটা ঘটে। কারণ প্রতিরোধ ব্যবস্থাটিকে নানাভাবে দমন করা হয়েছে বিশেষতঃ এ্যান্টিবায়োটিকের দ্বারা।

গ্রুপ ডি (লেভেল ১০-১২)ঃ এই স্তরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা রোগ শক্তির কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেছে। যেমন – ক্যান্সার জাতীয় রোগ শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়লে (Cancer with metastasis) বা বালবার প্যারালাইসিস (bulbar paralysis) ইত্যাদি রোগে এমনটি দেখা যায়। এই জাতীয় রোগীর একিউট রোগ প্রবণতা থাকেনা বরং তাদের কোন না কোন গুরুত্বপূর্ণ অংগ যেমন – কিডনী, হৃদপিন্ড, ফুসফুস, যকৃত ইত্যাদি আক্রান্ত। শুরু হয় অংগের কার্যগত রোগ দিয়ে শেষ হয় কাঠামোগত জটিলতায়।

অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখতে পাই যে সকল রোগী গ্রুপ – এ তে অবস্থান করছেন তাদের রোগ আরোগ্য সম্ভাবণা খুব ভাল ও তারা দ্রুত আরোগ্য হন। এ স্তরে রোগীর রোগের নাম যাই হোকনা কেন সঠিক চিকিৎসায় ইনশাল্লাহ আরোগ্য হয়ে যায়। তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও শক্তিশালী, তাদের দেহ-আবেগ-মন ইত্যাদির মধ্যে এখনও একটি ঐকতান বা ছন্দ বা সুন্দর সমন্বয় বিরাজমান। রোগলক্ষণাবলী পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। ফলে সহজেই সঠিক সাদৃশ্যযুক্ত আরোগ্যকর ওষুধটি নির্দেশত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য পৃথিবীব্যাপী এই লেভেলের রোগীর সংখ্যা দেশ-সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে ৩-৫%।

গ্রুপ – বি তে প্রতিরোধ ব্যবস্থা অধিক দুর্বল হতে শুরু করে। রোগের লক্ষণাবলী ততটা পরিষ্কার ভাবে প্রকাশিত হয়না। ঘন ঘন একিউট রোগ হওয়ায় এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তাররা ব্যাপকভাবে এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন। যা রোগীকে দ্রুত লেভেল – সি তে নিয়ে যায়।

গ্রুপ – সি তে তেমন ভাবে একিউট রোগ দেখা দেয়না কিন্তু রোগী ক্রমাগতভাবে অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। ক্রণিক রোগ নামে নানাধরণের পদ্ধতিগত রোগ (systematic disease) দেখা দেয়। যেমন – ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, এইডস্, রিউমাটয়েড আথ্রাইটিস, এথেরোস্ক্লেরেসিস ইত্যাদি।

গ্রুপ – ডি তে প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি রোগশক্তির নিকট পুরোপুরি স্যারেন্ডার বা কম্প্রোমাইজ করে ফেলেছে। এটি ক্রণিক রোগের চুড়ান্ত অবস্থা। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ খুঁজে পাওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। প্রধানত ক্ষতিকর এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা বিশেষতঃ এ্যান্টিবায়োটিক, ষ্টেরয়েড, কর্টিজন, পেইনকিলার সেবন এবং বিশৃংখল জীবনযাত্রা প্রণালী (undisciplined lifestyle) এর জন্য দায়ী। এক্ষেত্রে প্রতিবার হোমিও ওষুধ সেবনে রোগলক্ষণের তাৎক্ষণিক উপশম হয় কিন্তু অচিরেই রোগী আগের অবস্থায় ফিরে যান বা নতুন জটিলতা দেখা দেয়। অটিস্টিক শিশু, সিজোফ্রেনিয়া, যাদের ক্ষেত্রে ওষুধের অতিরিক্ত অপপ্রয়োগ হয়েছে এমন রোগী, মাল্টিপল স্কেলোরোসিস, ম্যালিগন্যান্ট ক্যান্সার ইদ্যাদি এই স্তরের রোগ। এ স্তরে রোগীকে নিরাময় করতে না পারলেও হোমিও চিকিৎসা আল্লাহর ইচ্ছায় উপশম দিতে সক্ষম।

সর্বশেষে, যে রোগী স্বাস্থ্যের যতটা নিচের লেভেলে অবস্থান করবেন, তার ততো অধিক ওষুধ ও আরোগ্যে অধিক সময় প্রয়োজন হবে। প্রতিটি ফলোআপে নির্দিষ্ট ক্রম ও রীতিতে একটির পর একটি ওষুধের প্রয়োজন হয়।

Dr. Benojir is trained by Prof. George at International Academy of Classical Homeopathy, Greece. To see the full list of doctors in 46 countries click here

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.