সব ঠিক আছেঃ এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার কিছু রোগীর সকল ল্যাবরেটরী পরীক্ষার রিপোর্ট নরমাল দেখে প্রায়শঃই যে মন্তব্যটি করেন তা হচ্ছেঃ “সব ঠিক আছে” (Nothing wrong with you)। তার কারণ তিনি শুধু ল্যাবরেটরীতে প্রস্তুত রোগীর বস্তুগত লক্ষণাবলী (objective symptoms) বা রিপোর্ট নিয়েই কাজ করেন। ফলতঃ রোগী ডাক্তারকে তার যে প্রকৃত কষ্টের কথা বলতে চান তা ডাক্তার অগ্রাহ্য করেন। রোগীর ব্যক্তিগত এই কষ্ট যা কেবল রোগীই অনুভব করেন তার নাম ব্যক্তিগত লক্ষণাবলী বা subjective symptom. ল্যাব টেস্টে কখনও ব্যক্তিগত লক্ষণাবলী ধরা পড়েনা অথচ হোমিওপ্যাথিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

স্যার উইলিয়াম মিলিগেন, এম.ডি বলে, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ প্রাথমিক অবস্থায় অতি সংগোপনে ও ভিতরে ভিতরে বেড়ে ওঠে, লক্ষণাবলী থাকে প্রধানত ব্যক্তিগত কষ্টকর অনুভুতির পর্যায়ে। আর যেহেতু এ পর্যায়ে স্থুল প্যাথলজিক্যাল পরিবর্তন সাধিত হয়না তাই ডায়গনসিস করাটা কঠিন হয়ে দাড়ায়। এই প্রাথমিক অবস্থায় রোগটি ধরা গেলে এবং ডাক্তার কর্তৃক আরোগ্যের এ সুযোগটি গ্রহণ করা হলে তা রোগটিকে অঙ্কুরেই বিনাশ করবে।”

স্যার জেমস ম্যাকেঞ্জি তার Symptoms And Their Interpretations গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন যে, “প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী রোগ প্রাথমিক স্তরে সংগোপনে বিস্তার লাভ করে এবং প্রধানত ব্যক্তিগত লক্ষণসমষ্টির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।” তিনি আরোও বলেন, রোগী কর্তৃক ব্যক্ত ঐ অনুভুতিসকলই (subjective symptom)  প্রশিক্ষিত ডাক্তারের গোচরীভূত লক্ষণাবলী, রোগচিহ্ন বা ল্যাবটেস্টে প্রাপ্ত লক্ষণাবলীর (objective symptoms) চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আর এখানেই হোমিওপ্যাথের সফলতা নির্ভর করে। ব্যক্তিগত লক্ষণাবলীকে সফল ব্যবহারের সামর্থই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারকে সাহায্য করে রোগীর কঠিন, জটিল ও অনারোগ্য অসুস্থতা থেকে রক্ষা করতে।

যে সকল রোগীর অনেক ব্যক্তিগত লক্ষণাবলী আছে – এ শ্রেনীর রোগী আরোগ্য করতে এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারকে অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করতে হয়। রোগীর ল্যাবটেস্ট করিয়ে তিনি সমঃস্বরে বলে ওঠেন “খারাপ কিছুই পাওয়া যায়নি!” (Nothing wrong detected”। ডাক্তার এলিজাবেথ রাইট হুবার্ড, এম.ডি., যিনি আমেরিকার একজন শীর্ষ হোমিওপ্যাথ তিনি এমন একজন রোগীর কথা স্মরণ করেন যে রোগী বলেছিলেন, “হ্যাঁ ডক্টর, হতে পারে আপনার বক্তব্য অনুযায়ী আমি পুরোপুরি সুস্থ; কিন্তু কেবল আমিই জানি যে আমি পীড়িত বা রুগ্ন ”। এখানেই এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তার আর কিছুই করার নেই। হোমিওপ্যাথ এজাতীয় রোগীকে স্বানন্দে স্বাগত জানান এবং রোগীকে দর্শনীয়ভাবে আরোগ্য করেন।

ডাক্তার ফাটক, এম.বি.বি.এস এবং একজন প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ একদা তার হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার হবার কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। ঘটনাক্রমে একদিন তিনি একটি হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকার সংস্পর্শে এলেন এবং সেটি কিনে এনে তার পাশে রাখলেন। একদিন তিনি এমন একজন রোগী দেখছিলেন যার শোল্ডার ব্লেড বা স্ক্যাপুলার মাঝে বরফশীতল ঠান্ডা লাগার অনুভূতি ব্যতীত আর কোন কষ্টকর লক্ষণই ছিলনা। রোগী এই অদ্ভুত কষ্টের জন্য অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরনাপন্ন হয়েছেন। কিন্তু কেউই বুঝতে পারেননি রোগটি আসলে কি ছিল। অবস্থাদৃষ্টে ডাক্তার ফাটক রোগীর জন্য হোমিও চিকিৎসার কথা ভাবলেন। তিনি পাশে রাখা হোমিপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকাটি খুললেন। একটির পর একটি ঔষধ সম্পর্কে পড়তে লাগলেন। আশ্চর্যজনক ভাবে তিনি এমন-মিউর নামক একটি ঔষধের সন্ধান পেলেন যাতে তিনি ঠিক ঐ লক্ষণটির বিবরণ পেলেন যা রোগীর মধ্যে বিদ্যমান। ক্ষীণ আশা নিয়ে তিনি সেটি প্রেসক্রাইব করলেন এবং দ্রুত ঐ রোগীর কথা ভুলে গিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ডাক্তার কল্পনাই করেননি যে রোগী এক সপ্তাহ পরে হাসিমুখে তার নিকট ফিরে আসবেন এবং বলবেন যে, মাত্র কয়েক ডোজ ঔষধেই তিনি আরোগ্যলাভ করেছেন এবং তার সকল জটিলতা ও কষ্ট দুর হয়েছে। এঘটনাই ডা. ফাটককে হোমিওপ্যাথি শুরু করতে অনুপ্রেরণা যোগায়।

আজকের লেখার শেষ পর্যায়ে আমার একটি কেস উল্লেখ করা যাক। একটি রোগী ডানদিকের শোল্ডার ব্লেডের উপর এক অদ্ভুত গরমদায়ক এবং মারাত্মক কষ্টকর অনুভূতি নিয়ে আমার শরণাপন্ন হন। তিনিও অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তাদের উপদেশমত প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু সব ডাক্তারই বলেছেন, “সবই ঠিক আছে” (Nothing wrong with you)। ঐ রোগী কথায় কথায় বললেন যে, তার সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে তার জন্ডিস হওয়ার পর থেকে। নিয়মানুযায়ী রোগীর কেস বিশ্লেষণ করা হয় যাতে চেলিডনিয়াম ম্যাজুস নামক হোমিও ঔষধটি স্পষ্টভাবে নির্দেশিত হয়। সুনির্দিষ্ট শক্তিতে রোগী মাত্র কয়েক মাত্রা ঔষধটি সেবন করে এবং মাত্র দুদিনেই রোগী আরোগ্যলাভ করেন। কি চমৎকার আরোগ্য!!!

ডা. বেনজীর আহমেদ একজন কনসাল্টেন্ট হোমিওপ্যাথ। বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *