আজকের লেখাটি তথাকথিত সার্জারীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন যে, আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে হাসপাতাল-ক্লিনিক আর ফার্মেসী। একদিকে এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক ফুলে-ফেঁপে উঠছে অপ্রয়োজনীয় ল্যাবটেস্ট ও সার্জারীর মাধ্যমে গলাকাটা বিল আদায় করে আর অন্যদিকে ডাক্তার বিনা প্রয়োজনে রোগীকে নানান ধরণের কমপক্ষে ডজনখানেক ঔষধ প্রয়োগ করে দু’হাতে অর্থ কামাচ্ছেন। কারণ রোগীর রোগ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তারা দেখেন ল্যাবরেটরী আর ঔষধ কোম্পানীর স্বার্থ। They are just selling sickness. আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নামক প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রেখেছেন এই ঔষধ কোম্পানীগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চাঁদা দিয়ে সেটাও তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে এদের এত তৎপরতার পরও আমাদের স্বাস্থ্যসেবার মানটি বেড়েছে না আমরা দিন দিন অধিক হারে এবং নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হচ্ছি? বিচারের ভারটা আপনাদের উপর আপাততঃ ছেড়ে দিলাম। ২০০৬ সালে অষ্ট্রেলিয়ার সিডনী শহরে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণার্থে গিয়েছিলাম। দেখে এসেছি সিডনী শহরে তখন মাত্র একটি বড় ফার্মেসী ছিল। সিডনীতে তখন ৪৫ লক্ষ লোক বাস করতেন। হাসপাতাল ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। সেখানে এখনো লাখে একটি মহিলাকে সন্তান প্রসবের সময়ও সিজারিয়ান অপারেশন করতে হয়না। অথচ আমাদের এ প্রয়োজনটি অতিমাত্রায়। কেন সে প্রশ্ন করার সময় এসেছে। আল্লাহর ইচ্ছায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে বিভিন্ন সার্জারীর রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হচ্ছেন বিনা অপারেশনে। মায়েরা বিনা অপারেশনে এখনও স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে সন্তান প্রসব করছেন।

আগেই বলেছি আজকের লেখা মূলতঃ সার্জারীর রোগীর বিষয়ে। এ জাতীয় অধিকাংশ রোগীর শরীরের ভিতরে বা বাইরে টিউমার জাতীয় কোন রোগের উৎপত্তি হয় শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ কোন রোগের কারণে তথা জীবনীশক্তির বিশৃংখলা বা দুর্বলতার জন্য। উদাহরণস্বরূপ, নাকের পলিপ (polyp), টনসিলের বৃদ্ধি (enlargement of tonsils) ও ইনফেকশন, পাইলস্ (piles), মহিলাদের জরায়ু (uterus), ডিম্বাশয়ের (ovary) বা স্তনের (breast) টিউমার (tumor), পুরুষদের প্রষ্টেটগ্লান্ডের বৃদ্ধি (enlargement of prostate) বা অন্ডকোষের (testes) অস্বাভাবিক গঠন বা বিকৃতি ইত্যাদি বিনা অপারেশনে আল্লাহর ইচ্ছায় শুধুমাত্র হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় আরোগ্য হওয়ার হাজারো সাফল্য আছে সারাবিশ্বের হোমিওপ্যাথদের। প্রয়োজন শুধু রোগীর লক্ষণসমষ্টির (totality of symptoms) সাথে মিলিয়ে সদৃশ মাত্রা ও শক্তিতে ঔষধ প্রয়োগ করা। সার্জনের মতো উল্লেখিত সার্জারীর কেস গুলিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সাফল্যের পরিবর্তে ব্যর্থতাই অবধারিত। রোগীর দেহ, মন, আবেগ, আধ্যাতিকতা কোনটিকেই এখানে অবজ্ঞা করা চলবেনা। কারণ রোগীর রোগ শিকড় হতে আরোগ্য হলে সার্জারীর বিষয়টিও আরোগ্য হয়ে যায়। আলহামদুলিল্লাহ্।

অপারেশনের ক্ষতিটি কি? যেখানে রোগের কারণ অভ্যন্তরীণ জীবনীশক্তির গোলযোগ সেখানে এ ধরণের রোগীকে অপারেশনের মাধ্যমে আরোগ্য করার চেষ্টা করা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় এ জাতীয় টিউমারের পুনরাবৃত্তি হতে অথবা টিউমারটি পূর্বের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ অংগে সৃষ্টি হতে। অধিকন্তু, অনেক ক্ষেত্রেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ অংগে টিউমারের পরিবর্তে অন্য কোন ক্রণিক রোগের আবির্ভাব হতে দেখা যায় যা রোগীর জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে। কারণ, অপারেশনের মাধ্যমে টিউমার নামক রোগের ডালপালাকে কেটেছেটে ফেলা হলেও এর শিকড় (root) কে কখনও স্পর্শ করা যায়না। অর্থাৎ রোগের প্রকৃত কারণটি (cause) বা এজাতীয় রোগ হওয়ার প্রবণতাটি (disposition) থেকেই যায়। আধুনিক সার্জারীর মাধ্যমে সহজেই টিউমার জাতীয় যেকোন বস্তুকে অপারেশন করা যায় সত্য কিন্তু রোগটি হওয়ার প্রকৃত কারণ বা প্রবণতাকে সার্জারী করে কখনও বিনাশ করা সম্ভব নয়। প্রবণতাকে দেখা যায়না, স্পর্শ করা যায়। এটি যন্ত্রে ধরা পড়েনা। তাহলে ডাক্তার কাটছেন টা কি সেটা ভেবে দেখা দরকার। অস্বাভাবিক এসব টিউমার রোগের কারণতো নয়ই বরং নিশ্চিতভাবে ভিন্ন কোন রোগের ফলাফল (end result)। ফলাফল নিয়ে মাতামাতি করলে প্রকৃত কারণকে ডাক্তার কিভাবে দূর করবেন? কার্যকারণ সম্পর্ক (cause and effect relationship) বিশ্বাস করলে এটা বুঝতে হবে যে, কারণটি বর্তমান থাকলে সেটি কোন না কোন ফলাফল তৈরী করবেই। খুবই সহজ সমীকরণ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় – শ্বাস যন্ত্রের রোগের ক্ষেত্রে নাকের পলিপ অপারেশন করলে তা পরবর্তীতে টনসিলের ইনফেকশন এবং বিবৃদ্ধিতে (enlargement of tonsils) রূপান্তরিত হয়। আর টনসিল অপারেশন করলে রোগী ফুসুফুসের সংক্রমণে ভুগতে থাকে। ফলতঃ প্রতিনিয়ত ঠান্ডা-সর্দি-কাশি, নিম্ন তাপমাত্রায় জ্বর লেগেই থাকে। একটির পর একটি ভুল চিকিৎসায় এই রোগী এক পর্যায়ে হাঁপানী (asthma) কিংবা যক্ষা (tuberculosis) রোগীতে পরিণত হয়। বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত অনারোগ্য (incurable) রোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিমধ্যে হাঁপানী ও যক্ষা এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এ তথ্য তথাকথিত আধুনিক মেডিকেল গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের। নাকের পলিপটি না কাটলে রোগী আজ এ যক্ষা বা হাঁপানী রোগীতে রূপান্তরিত হতোনা। অথবা ধরুন, মহিলাদের জরায়ুর টিউমার (Tumor of uterus) অপারেশন করলে এটি পরবর্তীতে ডিম্বাশয়ে স্থানান্তরিত হয় (metastasis to ovary)  এবং ওভারীর অপারেশন করালে টিউমারটি স্তনে বাসা বাঁধে। সার্জারীর মাধ্যমে বিনা কারণে পুরো জরায়ু বা ওভারী বা স্তন অপারেশন সত্যিই নির্দয় ও অমানবিক চিকিৎসা। আবার দেখা যায়, পাইলস এর চিকিৎসায় সার্জারীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোগীকে অতিদ্রুত হৃদরোগীতে পরিণত করে। অতএব এ জাতীয় ক্ষেত্রে অপারেশন নিষ্প্রয়োজন। অন্ততঃ বিনাইন (benign) টিউমারের ক্ষেত্রে। বিনাইন টিউমার কখনো ক্যান্সারে (cancer) রূপান্তরিত হয় না। তাই অপারেশন করার প্রসংগটাই অবান্তর। তবে হ্যাঁ টিউমারটি যদি পরীক্ষা করে ইতিমধ্যে ক্যান্সারে রুপান্তরিত হওয়ার এবং শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ার (metastasis) প্রমাণ না পাওয়া যায় তবে অপারেশনের কথা ভাবা যায়। উদ্দেশ্য রোগী যে কটি দিন বাঁচেন তাকে কিছুটা হলেও তার কষ্টটা কমিয়ে শান্তিপূর্ণভারে শেষ পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া। বরাদ্দকৃত হায়াতের এক সেকেন্ড পূর্বে বা পরে রোগীর মৃত্যু ঘটার কোনই কারণ নেই। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার দাবী যারা করেন তারা কি আসলেই চিকিৎসক? লাইফ সাপোর্টের অর্থ হচ্ছে রোগীকে intensive care এর নামে অনেক কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীর পরিবারকে সর্বসান্ত করে দেওয়া। আর চিকিৎসার নামে মৃত রোগীকে intensive care unit (ICU) এ আটকে রেখে অধিক বিল আদায় এদেশের নামী-দামী হাসপাতালগুলোতে তো অহরহ ঘটছে।

তবে ক্যান্সারের রোগীকে অপারেশনের পর কেমোথেরাপী দেয়ার পূর্বে যদি রোগীর লক্ষণসমষ্টি ও হ্রাস-বৃদ্ধি (modality) সুষ্পষ্টভাবে জানা যায় তবে আল্লাহর ইচ্ছায় হোমিওপ্যাথিতেও ক্যান্সার আরোগ্য হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কেমোথেরাপীর পর রোগীর শরীরে কষ্ট-যন্ত্রণা ব্যতীত এবং কেমোথেরাপীজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া রোগী আর কিছু দিয়ে হোমিও ডাক্তারকে সাহায্য করতে পারেনা। যা পাওয়া যায় তা হলো ল্যাবটেস্ট নির্ভর বস্তুগত লক্ষণসমষ্টি (objective symptoms)। আমাদের চিকিৎসায় যদি এ অবস্থায়ও রোগীর মধ্যে বিরল (rare), অদ্ভুত (peculiar) বিশেষ (characteristic) subjective লক্ষণাবলী পাওয়া যায় তবে রোগী আরোগ্য হবেন ইনশাল্লাহ্।

হোমিওপ্যাথি কি তাহলে সার্জারীর বিরুদ্ধে? মোটেই না। কারণ, রোগের কারণ যদি প্রকৃতপক্ষে বাহ্যিক (external) হয় যেমন – কোন দুর্ঘটনার (accident) কারণে টিউমার বা এ জাতীয় রোগ হয় বা পুড়ে যায় তবে সেক্ষেত্রে বরং অভ্যন্তরীণ ঔষধ প্রয়োগ আগেই সার্জারীর কথাটা ভাবা উচিত। বহুদিন পূর্বের কোন আঘাতের ফলে সৃষ্ট টিউমারও হোমিও চিকিৎসায় আরোগ্য হতে দেখা গেছে। আমরা সার্জারীর বিরোধিতা করছিনা কিন্তু আমাদের বক্তব্য হচ্ছে ৯০% এরও বেশী ক্ষেত্রে সার্জারী না করেও রোগী পূর্ণ আরোগ্য করা যায়।

সার্জারীর ক্ষেত্র হতে পারে দুর্ঘটনাজনিত যেকোন পরিস্থিতি। কারণ, প্রকৃত কারণটি এখানে বাহ্যিক। যেমন ধরুন, কোন রোগীর দুর্ঘটনাজনিত কারণে অংগপ্রত্যংগের বিকৃতি দেখা দিলে, ফ্রাকচার (fracture) হলে, কোন অংগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলে অবশ্যই অবিলম্বে অভিজ্ঞ সার্জনের দারস্থ হওয়া দরকার। তবে অস্থি বা হাড়ের যেকোন ধরণের ফ্রাকচার হলে বা ভেংগে সেটি যথাস্থানে সেট করার পর হোমিওপ্যাথিক ঔষধ রোগীকে through quick union of bones এর মাধ্যমে দ্রুত সারিয়ে তোলে।

সর্বশেষে বলবো এতদিন চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের দোরগোড়ায় ছিল। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশেষতঃ মোবাইলের এই যুগে এর সাথে ইদানীং যুক্ত হচ্ছে টেলি মেডিসিন। চিকিৎসা সেবা এখন দরজার বাইরে থেকে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করেছ অর্থাৎ এটি আমাদের হাতের মুঠোয়। মনে রাখবেন ঐ ডাক্তার টেলিমেডিসিনের নামে আপনার বা রোগীর নয়; বরং মোবাইল ও ঔষধ কোম্পানীর স্বার্থটাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। কারণ চিকিৎসাসেবার নামে তাদের প্রয়োজন বাজার দখল ও তা সম্প্রসারণ; রোগীর সেবা নয়।

ডা. বেনজীর আহমেদ একজন কনসাল্টেন্ট হোমিওপ্যাথ। বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.