স্ট্রেস বা চাপ আমাদের জীবনের একটি অস্বাভাবাবিক মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া। প্রাত্যহিক জীবনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে গিয়েই আমাদের শারীরিক-মানসিক স্তরে এই প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আমাদের সবাই জীবনের কোন কোন ক্ষেত্রে কোন না কোন স্ট্রেস বা চাপের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।
জেনে নেই স্ট্রেসে আছেন বুঝবেন কি করে? এর লক্ষণাবলী হলো:
আবেগের ক্ষেত্রে লক্ষণ: রেগে যাওয়া, হতাশাগ্রস্থ হওয়া, মেজাজের পরিবর্তন, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, রিলাক্স করতে না পারা, একাকীত্বে ভোগা, বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়া, অন্যকে এড়িয়ে চলা।
স্ট্রেসের শারীরিক লক্ষণাবলী: এনার্জি হারিয়ে ফেলা, মাথাব্যথা, ডায়রিয়া-কোষ্ঠ্যকাঠিন্য-বিবমিষা তথা স্টমাক আপসেট, শরীরের নানা স্থানে ব্যথা, অতিরিক্ত হৃদস্পন্দন, অনিদ্রা, ঘন ঘন ঠান্ডা ও ইনফেকশনে ভোগা, যৌন সমস্যা, কানে কম শোনা, নার্ভাসনেস, হাত-পা ঘামা, দাঁত কিড়মিড় করা।
আচরণগত লক্ষণাবলী: ক্ষুধায় পরিবর্তন যেমন কম বা বেশী খাওয়া, ঢিমেতেতালা বা দায়িত্ব এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত ধুমপান, মদ্যপান, ড্রাগ সেবন, স্নায়বিক আচরণ যেমন- নখ কামড়ানো, স্নায়বিক অস্থিরতায় ভোগা।
কগনিটিভ লক্ষণাবলী: ক্রমাগত দু:শিন্তা, ভুলে যাওয়া, বিশৃংখলা, অমনোযোগিতা, বিচারশক্তিহীনতা, হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়া, সবকিছুতে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করা।
স্ট্রেস আমাদের জীবনকে কতভাবে প্রভাবিত করে তা বলে শেষ করা যাবেনা। তাই আসুন জেনে নেই স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস এবং কৌশল। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট হলো আপনার জীবন, চিন্তাধারা আবেগ সবকিছুর উপর সুন্দর একটি নিয়ন্ত্রণ। নিম্নের কয়েকটি অভ্যাসের মাধ্যমে আপনার এই স্ট্রেসকে কাটিয়ে উঠার জন্য সফলতার সাথে কাজে লাগাতে পারেন।
1. সময় ব্যবস্থাপনা (Manage your time): সময় ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। উৎপাদনক্ষম ও সফল জীবনের জন্য আমাদের এই দক্ষতাটির উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন। আমাদের সবার জন্য দৈনিক ২৪ ঘন্টা সময় নির্ধারিত। আমাদের জানতে হবে কিভাবে পরিপূর্ণরূপে এই নির্দিষ্ট সময়কে ম্যানেজ করা যায়। এখানে এমন কিছু বাস্তবভিত্তিক টিপস দেয়া হলো যা আপনি অবিলম্বে কাজে লাগাতে পারেন:
(ক) আপনার সময়কে বিশ্লেষণ করুন। দেখুন কোত্থেকে স্ট্রেসটি আসছে।
(খ) একটি কাজের তালিকা (To-Do list) তৈরী করুন। যাতে করে পরিকল্পনা মত আপনি আপনার নির্দিষ্ট কাজগুলি করে যেতে পারেন। এই তালিকাটি ধরেই আগান এবং এর বাইরে অন্য কোন কাজ থাকলে তা এটি শেষ করার পর করুন। আপনার জন্য একটি বার্ষিক, মাসিক, সাপ্তাহিক ও দৈনিক কর্ম পরিকল্পনা তৈরী করতে পারেন। এই পরিকল্পনাটি আপনাকে সহজেই জীবনে একটি ধাপ হতে আরেকটি ধাপে পৌঁছে দেবে ইনশাল্লাহ।
(গ) অগ্রাধিকার ঠিক করুন (Prioritize)- আপনার টু-ডু লিস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরী কাজগুলিকে অগ্রাধিকার দিন। এর পর বাকী গুলি ধরুন। The Prophet (PBUH) said, “There are two blessings which many people lose: (They are) Health and free time for doing righteous deeds.” (Saheeh Bukhary). সময় ব্যবস্থাপনা প্রকৃতপক্ষে স্ট্রেস কমানোর একটি প্রমাণিত পদ্ধতি।

2. অধিকক্ষণ ঘুমান (Get more sleep): আপনি যথেষ্ট পরিমাণে না ঘুমালে আপনার শরীর-মন ভুগবে। ফলে কাজে অমনোযোগিতা ও স্ট্রেস দেখা দেবে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক ৭-৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। ঘুমকে আল্লাহর মহত্বের একটি লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মহান আল্লাহ্ বলেন, “তাঁর আরও নিদর্শনঃ রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর কৃপা অন্বেষণ। নিশ্চয় এতে মনোযোগী সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে। (Al-Quran, 30:23)”
3. শারীর চর্চা (Exercise): শরীর চর্চা একটি অত্যন্ত ফলদায়ক কৌশল। স্বাস্থ্যবান জীবনের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। শরীর চর্চা কেবল সুস্থ দেহের জন্য নয় বরং সুস্থ মনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্যায়াম দুর্বলতা দুর করে, সতর্কতা ও মনোযোগের উন্নয়ন ঘটায় এবং মস্তিষ্কের সার্বিক জ্ঞানীয় কার্যাবলী তথা কগনিটিভ ফাংশনকে বৃদ্ধি করে। স্ট্রেস যখন আপনার এনার্জি ও মন:সংযোগের ক্ষমতাকে নি:শেষ করে দেয় তখন শরীর চর্চা বিশেষভাবে সহায়ক। Harvard school of public health এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন প্রাপ্ত বয়স্কের দৈনিক গড়ে ২০-২৫ মিনিট মধ্যম তীব্রতার ব্যায়াম (moderate-intensity exercise) করা দরকার। এর মধ্যে থাকতে পারে- দ্রুত হাটা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি।

4. না বলতে শিখুন (Learn to say “No”): আপনার দৈনন্দিন বা সাপ্তাহিক পরিকল্পনা মাফিক আপনার কাজে মারাত্মক বাধাগ্রস্থ করে এমন কম গুরুত্বপূর্ণ কাজকে ”না” বলতে শিখে আপনি আপনাকে ফেভার করুন। কাউকে অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি প্রদান এড়িয়ে চলুন। গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে যে সকল কাজ আপনি দক্ষতার সাথে করতে পারবেন শুধু সে সকল কাজের ক্ষেত্রেই ”হ্যাঁ” বলুন।

5. কাজের মাঝে বিরতি নিন (Take breaks between the activities): কাজের ফাঁকে মাঝে মধ্যে ছোট্ট বিরতি নিয়ে একটু রিলাক্স করে নিন। অংগ প্রত্যংগ প্রসারিত বা টানাটানি করা (stretching), ধ্যান করা (meditating), চা পান, মুক্ত বাতাসে কিছুক্ষণ হেটে আসা, সম্ভব হলে কয়েক মিনিটের জন্য ঘুমিয়ে নিতে পারেন (taking a short nap)। মুল কথা হলো কাজের ফাঁকে একটি বিরতির প্রয়োজন। আপনি ৪৫-৫০ মিনিট কাজ করার পর একটি বিরতিতে যান। এতে করে পরবর্তী কাজটি অনেক সুন্দরভাবে করতে পারবেন। মহান আল্লাহ্ কোরআনে বলেন, ”আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছ, হে আমাদের প্রভূ! এবং আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন কর। আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের প্রভু। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কে সাহায্যে কর।” (Al-Quran, 2:286)

সুতরাং আপনার সাধ্যে যতটুকু সম্ভব, ততটুকই করুন, আল্লাহর সাহায্যের জন্য দোয়া করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করুন।

Dr. Benojir is trained by world’s best homeopath Prof. George Vithoulkas. See the list of homeopaths worldwide trained by Prof. George Click Here

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *