হোমিও কেস এ্যানালাইসিসঃ হোমিওপ্যাথিক কেস বিশ্লেষণের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে রোগীর জন্য এমন একটি ওষুধ অনুসন্ধান করা যার লক্ষণাবলী রোগীর রোগলক্ষণাবলীর সাথে নিকটতম সাদৃশ্য (closest match) প্রদর্শন করে। কারণ, এই লক্ষণাবলী হচ্ছে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা defence mechanism কর্তৃক উৎপাদিত প্রতিক্রিয়া (reaction)। মানুষ রোগাক্রান্ত হলে তার রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাবতীয় লক্ষণাদি প্রকাশ করে নিরাময়ের জন্য এভাবেই বাইরের সাহায্য চায়।

হোমিওপ্যাথি “Similia Simibus Curentur “ নামক প্রাকৃতিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর অর্থ হচ্ছে – ”যে ওষুধে কৃত্রিমভাবে যে রোগ সৃষ্টি করে, সে ওষুধেই আবার প্রাকৃতিকভাবে সেই রোগ নিরাময় করে।” তাই আমরা সুস্থ মানবদেহে ওষুধের পরীক্ষকালীন (proving) ওষুধ কৃত্রিমভাবে যে রোগলক্ষণ উৎপাদন করে, সেগুলি ব্যবহার করে প্রাকৃতিক রোগ চিকিৎসায় সফলতা অর্জন করি। হোমিওপ্যাথির জনক হ্যানিম্যানই প্রথম ব্যক্তি যিনি বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই প্রাকৃতিক অথচ নিয়মানুগ পদ্ধতির (systematic method) উদ্ভাবন করেন। হ্যানিম্যানই প্রথম ব্যক্তি যিনি বিভিন্ন ভেষজ উপাদান নিজের উপর পরীক্ষা করেন এবং গবেষণার জন্য পরবর্তীতে অনেক স্বেচ্ছাসেবকের উপর এই পরীক্ষা চালান। তাঁর পূর্বে সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও অনুমানের উপর ভিত্তি করে রোগীকে ওষুধ প্রয়োগ করা হতো। আধুনিক মেডিসিনে এখনও ইঁদুর, বিড়াল, বানর, গিনিপিগ ইত্যাদির উপর ওষুধ প্রয়োগ করে তা মানুষের রোগে প্রয়োগ করা হয়। এ কেমন আধুনিক চিকিৎসা?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে – কেন আমরা প্রুভিং এ পাওয়া লক্ষণাবলীকে রোগীর আরোগ্যের জন্য ব্যবহার করি? প্রুভিং এর সাথে রোগীর রোগলক্ষণাবলীর সংযোগটি কোথায়? হোমিওপ্যাথিতে আমরা জানি, রোগলক্ষণাবলী হচ্ছে – রোগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার ফল। বাইরের যেকোন কারণের প্রভাবে মানুষ রোগাক্রান্ত হলে প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোগলক্ষণ সৃষ্টির মাধ্যমে সাড়া দেয় এবং রোগীর জীবনকে রক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমাদের সবার মধ্যেই এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি সার্বক্ষণিক সক্রিয়। এটি প্রতিটি মূহুর্তে আমাদের ভেতর একটি ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সক্রিয় থাকে। আর এভাবে মানবসত্তায় (human organism) কোন বিশৃংখলার সৃষ্টি হলে সেখানে শৃংখলা আনায়ন করে। বিশৃংখলাটি খুব বড় আকারে উপস্থিত না হলে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা দৃষ্টিগোচরভাবে লক্ষণ উৎপাদন না করলে আমরা এর কার্যাবলী বুঝতেই পারি না। প্রাথমিক অবস্থায় লক্ষণাবলী যতটুকু সম্ভব পরিধিতে (periphery) অর্থাৎ প্রান্তঃদেশীয় অংগ-প্রত্যংগে প্রকাশিত হয়। এভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ অংগকে (vital organ) রোগাক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। প্রুভিং এ আমরা প্রুভারের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আলোড়িত না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট ভেষজ উপাদান সেবন করিয়ে যাই। প্রুভিং – এ প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি লক্ষণাবলী উৎপাদন করতে শুরু করে ঠিক সেভাবেই যেভাবে প্রাকৃতিক রোগে একজন রোগীর মধ্যে রোগলক্ষণাবলী উৎপাদিত হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে ও প্রুভিংকালীন রোগলক্ষণাবলী একইভাবে প্রভাবিত হয়। মূলতঃ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জীবনী শক্তিকে রক্ষা করার জন্য একই ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। রোগীর জন্য আরোগ্যদায়ক ওষুধটি খোঁজার জন্যই আমরা প্রুভিং এর লক্ষণাবলীকে রোগীর লক্ষণাবলীর সাথে তুলনা করি। স্যামুয়েল হ্যানিম্যান বলেন – হোমিওপ্যাথ যখন রোগীর জন্য একটি ওষুধ অনুসন্ধান করবেন তখন নিজেকে প্রশ্ন করবেন – ”প্রুভিং- এর সময় প্রুভারের উপর এই ওষুধটির কি প্রভাব ছিল।” এই প্রভাবটির সাথে প্রাকৃতিক রোগলক্ষণাবলীর সাদৃশ্য তুলনা করবেন। কারণ, কৃত্রিম রোগে (proving) যে ওষুধে যে লক্ষণাদি সৃষ্টি করে প্রাকৃতিক রোগে সে ওষুধই সেই রোগ আরোগ্য করে। যদি নির্বাচিত ওষুধটি সঠিক শক্তি ও মাত্রায় সেবন করানো হয় তবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইতিবাচকভাবে আলোড়িত হয়ে রোগশক্তির চেয়ে অধিক শক্তিশালী হয় এবং প্রাকৃতিক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে রোগীকে রক্ষা করে বা রোগমুক্ত করে। আধুনিক চিকিৎসা করছে ঠিক এর বিপরীত কাজ।

যারা হোমিওপ্যাথিক কেস এ্যানালাইসিস পদ্ধতির সাথে পরিচিত নন তারা জেনে আশ্চর্য হবেন যে, হোমিওপ্যাথিতে শুধুমাত্র রোগীর প্যাথলজিক্যাল ডায়গনসিস দেখে ওষুধ নির্বাচন করা হয়না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটেই প্যাথজেনেটিক নয় এমন সব লক্ষণাদির উপর ভিত্তি করেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আমরা রোগীর অদ্ভুত ও স্বাতন্ত্র্যসূচক লক্ষণাদিকে অধিক গুরুত্ব দেই। অন্যকথায়, মানবসত্ত্বার প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে যে বিষয়াবলী হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে আমরা তার প্রতি প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বতন্ত্র প্রতিক্রিয়াকেই অধিক গুরুত্ব দেই। উদাহরণস্বরূপ – একজন রোগীর ক্রণিক ব্রংকাইটিস ডায়গনসিস হলো। কিন্তু তার আরোগ্যদায়ক ওষুধটি (curative medicine) হিসেবে নির্বাচিত হলো যেসব লক্ষণের ভিত্তিতে সেগুলো হচ্ছে – (১) ১৩.০০ টার দিকে কাশি বৃদ্ধি, (২) রোগীর বিষন্নতা প্রবণ, (৩) লবনাক্ত মাছ খেতে পছন্দ করে (৪) কেবল ডান পার্শ্বে শয়নে উপশম ইত্যাদি। যে কারণে উপরোক্ত লক্ষণাদি ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো – প্রতিরোধ ব্যবস্থা চলমান রোগটি (নিউমোনিয়া) হতে পরিত্রাণ পাবার চেষ্টায় রোগীর দেহ-মনে এজাতীয় লক্ষণাদি উৎপাদন করেছে। লক্ষণাদি মানসিক, আবেগিক বা শারীরিক যেকোন ক্ষেত্রেই প্রকাশিত হতে পারে। আবার সার্বিকভাবে বা স্থানীয়ভাবে বা শুধুমাত্র আক্রান্ত অংগেই আসল রোগটি অবস্থান করতে পারে। আমরা প্রুভিং চলাকালীন লক্ষ্য করি যে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা মানবসত্ত্বার ভিন্ন ভিন্ন অংগ প্রত্যংগে ভিন্নভাবে একইরূপ লক্ষণাদি উৎপাদন করে। খুব সহজেই উপসর্গের উপর ভিত্তি করেই আরোগ্যদায়ক ওষধটির সন্ধান পাওয়া যায়। কারণ, সার্বিক লক্ষণাবলী একই প্যাথলজি থাকা সত্ত্বেও একটি রোগীকে অন্য রোগী হতে পৃথক করে দেয়।

তাই সঠিক হোমিও ওষুধটি খুঁজে পেতে হোমিওপ্যাথকে সামগ্রিক লক্ষণাদি (totality of symptoms) কে বিবেচনা করতে হবে। এই লক্ষণাদি প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র্য (individual)। এই স্বতন্ত্র্য লক্ষণটি শনাক্ত করা যায় রোগীর অদ্ভুত ও তীব্র কোন প্রতিক্রিয়ার মধ্যে। যে সকল ক্ষেত্রে এই অদ্ভুত লক্ষণের সন্ধান পাওয়া যায়না সেখানে আমরা সবচেয়ে তীব্র বা মারাত্মক লক্ষণাদির উপর নির্ভর করি।

স্বাতন্ত্র্যসূচক লক্ষণটি খুঁজে পেতে আমরা বিশেষ মনোযোগ নিবদ্ধ করি রোগটির সম্ভাব্য কারণ ও প্রতিপালক কারণের উপর (causative and disease maintaining factors). মহাত্মা হ্যানিম্যান সর্বদাই রোগের কারণ খুঁজতেন এবং তা অপসারণের চেষ্টা করতেন।

সুতরাং রোগীকে প্রেসক্রাইব করার জন্য যে ৩ টি বিচার্য বিষয়ের উপর আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হয় তা হলো – অদ্ভুত বিশেষত্বসূচক লক্ষণ, লক্ষণের তীব্রতা এবং রোগের মুল বা প্রতিপালক কারণ।

লক্ষণাদির ভাল মূল্যায়ন করার জন্য এবং সঠিক ওষুধটি খুঁজে পাবার জন্য আমরা একটি পূর্বাভাস (prognosis) তৈরী করি। এরপর আরোগ্যদায়ক ওষুধটি খুঁজে পেতে যে কৌশলটি আমাদের সবচেয়ে ভাল ফল দিবে সেটির দিকে মনোনিবেশ করি।

সর্বোপরি, লক্ষণাদি সংগ্রহের পর তা বিশ্লেষণের সময় আমরা সংক্ষেপে নিম্নোক্ত ধাপগুলো অনুসরণ করিঃ

১. একটি পূর্বাভাব (prognosis) তৈরি করি, ২. স্বাতন্ত্র্যসূচক লক্ষণাদির (distinctive symptoms) অনুসন্ধান করি ৩. উপযু্ক্ত ওষুধ খুঁজে পেতে একটি যথাযথ কৌশল (strategy) অবলম্বন করি ৪. নিকটতম সাদৃশ্যযুক্ত ওষুধসমূহের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য নিরুপণ করি (comparative study) ৫. সবচেয়ে সদৃশটি ওষুধটি (Most similar) নির্বাচন করি এবং ৬. এমন একটি শক্তি (potency) ও মাত্রা (dose) নির্বাচন করি যার দ্বারা চিকিৎসা শুরু করা হবে।

আর হোমিওপ্যাথিক কেস বিশ্লেষণে আধুনিক সফটওয়্যার অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে।

ডা. বেনজীর বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *