হোমিওপ্যাথ হিসেবে আমাকে প্রায়শই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। যে কারণে আজ এ লেখা। প্রশ্নটি হলো – হোমিওপ্যাথি কি সব রোগ সারাতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে একটি কথা দৃঢ়ভাবে লিখতে চাই যে হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক, সুদুরপ্রসারী, অথচ সুনির্দিষ্ট। এর প্রভাবাধীন ক্ষেত্রের (sphere of influence) অন্তর্গত যে কোন রোগ তা যদি আরোগ্য সীমার (curable stage) মধ্যে থাকে তবে হোমিওপ্যাথি তা সম্পূর্ণভাবে ও স্থায়ীভাবে আরোগ্য করতে সক্ষম ইনশাল্লাহ্। তবে আমাদের কাছে রোগীর (রোগের নয়) ডায়াগনসিস (diagnosis) একটু ভিন্ন ধরণের। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক ডায়াগনসিস করতে ল্যাবটেস্টের শরণাপন্ন হন। টেস্ট রিপোর্ট নরমাল না পেলে তিনি একটি রোগের নাম দেন। এখানে উল্লেখ্য, এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক ল্যাবটেস্টের উপর ভিত্তি করে রোগের যে নামকরণ করেন তার কোন চিকিৎসাই তাদের হাতে নেই। যেমন, ডায়বেটিস, হৃদরোগ, এ্যাজমা, উচ্চ রক্তচাপ, যক্ষা ইত্যাদি নাম জানা বা নাজানা অনেক রোগ। একথা এজন্য বলা যে, এ চিকিৎসার শুরু আছে বটে; কিন্তু কোন শেষ নেই। আজব চিকিৎসা!!! যার ফলে রোগী একটির পর একটি নতুন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ব্যতিক্রম কেবল সার্জারীর প্রকৃত ক্ষেত্র। আর হোমিওপ্যাথের নিকট রোগীর ডায়াগনসিস ব্যক্তির অনভূতিকে কেন্দ্র করে। রোগভোগকালীন রোগী কি কষ্ট অনুভব করেন, তার কি শারীরিক, মানসিক, আবেগগত সমস্যা সবই রোগী ডাক্তারকে খুলে বলেন যা তার নিকট অস্বাভাবিক মনে হয়, যার কারণে সে সুস্থবোধ করেনা, দৈনন্দিন জীবনযাপন তার নিকট কষ্টের মনে হয়। জীবনের ছন্দপতন হয়। আর এসব বিষয়ের কোনটাই যন্ত্রে বা ল্যাবটেস্ট ধরা পড়েনা। ল্যাব টেস্টে কেবল ধরা পড়ে রোগের ফল, রোগ নয়।

আঘাত লেগে যার দেহে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে বা হাড় ভেংগে গেছে, কিংবা অংগ বিকৃত হয়েছে অথবা ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত নড়ে গেছে তাকে অবশ্যই শল্যচিকিৎসকের (surgeon) কাছে নিতে হবে।

হোমিওপ্যাথির ক্রিয়াক্ষেত্র তখনই উপস্থিত হয় যখন ব্যক্তিমানুষ সামগ্রিকভাবে পীড়িত হয়, যখন দেহতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং সেই হারানো শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনে বাইরের সাহায্যের জন্য স্বতঃস্ফূর্ত আবেদন ওঠে লক্ষণরাজির মাধ্যমে। বাহ্যিক কারণে যে পীড়ার বা অস্বাচ্ছন্দ্যের উৎপত্তি হয়, যা কোন এক বিশেষ অংগে উৎপন্ন হয় এবং সেখানেই অবস্থান করে, যা সমগ্র সত্তাকে আক্রান্ত করে না হোমিওপ্যাথি সেখানে প্রত্যক্ষভাবে বিশেষ কোন ক্রিয়া করে না।

রোগের চিহ্ন ও লক্ষণরাজি মিলিতভাবে আমাদের কাছে অভ্যন্তরীণ রোগের এক প্রতিচ্ছবি (image) তুলে ধরে। এর দ্বারা আমরা জানতে পারি রোগীর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও সংগ্রামের প্রকৃতি এবং সেই সংগ্রামে যে সাহায্য একান্ত জরুরী তার প্রকৃতিও। কারণ সুস্থ মানবদেহে ওষুধ প্রুভিং-এ এটি প্রমাণিত হয়েছে। এ্যালোপ্যাথিতে যেমন অবৈজ্ঞানিকভাবে ইঁদুর, বিড়াল, বানর, গিনিপিগ ইত্যাদি প্রাণীর উপর ওষুধ প্রয়োগ করে তা মানুষের রোগ নিরাময়ে প্রয়োগ করা তা হোমিওপ্যাথিতে কখন হয়না।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার বিষয় হলো বিশৃঙ্খল জীবনীশক্তি এবং সেই ক্রিয়ার দরুণ রোগীর ক্রিয়াগত পরিবর্তন (disordered vital phenomena and functional changes in the individual patient) । এই চিকিৎসার উদ্দেশ্য হলো রোগীর প্রাণক্রিয়ার সংহতি ও শৃঙ্খলার পুনঃস্থাপন এবং রোগীর স্বাভাবিক অবস্থায় পুনরুদ্ধার। হোমিওপ্যাথির নীতি হলো, গতি বিষয়ক নীতি, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নীতি – যা নিউটনের গতিবিষয়ক তৃতীয় নীতি দ্বারা সূত্রবদ্ধ – প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে (for every action, there is an equal and opposite reaction)। হোমিওপ্যাথি প্রকৃত রোগীকেই সারাতে পারে, রোগের কারণ বা পরিণাম ফল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার লক্ষ্য নয়। তবে প্রকৃত রোগী আরোগ্য হলে রোগের ফলও দুরীভূত হয়।

টিউমার, অর্বুদ, ফোঁড়া, আলসার, ক্যান্সার ইত্যাদি কোন রোগ নয়, রোগের পরিণাম ফল (end products)। টিউমার হয়েছে কাজেই লোকটি পীড়িত এ ধারণা ভ্রান্ত। ব্যক্তিমানুষের মধ্যে রোগক্রিয়া বর্তমান রয়েছে বলেই টিউমার দেখা দিয়েছে। টিউমার, আলসার ইত্যাদি দেখা যাওয়ার বহুপূর্ব হতে রোগক্রিয়া শুরু হয়েছিল। রোগক্রিয়াকে যদি বিনাবাধায় অগ্রসর হতে দেওয়া হয় তবেই তা হৃদপিন্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, চর্ম ইত্যাদি দেহের কোন অংগে কেন্দ্রীভূত (localized) হয়।

যে কোন রোগে, তার যে নামই দেওয়া হোক না কেন, হোমিওপ্যাথ কার্যকরী হবে যদি সেই রোগে লক্ষণরাজি (symptoms) বর্তমান থাকে। এখানে লক্ষণবলতে আমরা অবশ্যই সম্পূর্ণ লক্ষণ (complete symptoms) বুঝি, অর্থাৎ যার নির্দিষ্ট অবস্থান (location), অনুভূতি (sensation), উপশম-উপচয় বা হ্রাস-বৃদ্ধি (modality) এবং আনুষংগিক লক্ষণ (concomitants) বর্তমান আছে। যেখানে রোগলক্ষণ অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ বা সাধারণ ধরণের সেখানে হোমিওপ্যাথি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীন বা কম। অন্ততঃ সময়সাপেক্ষ।

যেখানে রোগলক্ষণসমূহে সদৃশ লক্ষণরাজি সুস্থদেহে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের প্রুভিংকালীন পাওয়া যায়নি বা যেখানে রোগলক্ষণের সদৃশ লক্ষণ মেটেরিয়া মেডিকায় পাওয়া যায়না, সেখানে হোমিওপ্যাথি কার্যকরী নয়। সাধারণত যখন রোগ অসাধ্যস্তরে (incurable stage) চলে যায় তখন এমন অবস্থা দেখা যেতে পারে। আর এ অবস্থা সৃষ্টি হয় এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (side effects) স্বরুপ। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগ লক্ষণ, তার হ্রাস-বৃদ্ধি চাপা পড়ে যায়। ডাক্তার ভ্রান্তভাবে একেই আরোগ্য বলে থাকেন।

যেখানে কোন রোগ নেই অর্থাৎ রোগী সুস্থ, সেখানে দেহীর সুস্থাবস্থায় পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য হোমিওপ্যাথি কার্যকরী নয়। উদাহরণ স্বরূপ- জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য, মোটা হওয়ার জন্য বা রোগা (slim) হওয়ার জন্য, কিংবা জীবনীশক্তির স্বাভাবিক ফল বন্ধ করার জন্য হোমিওপ্যাথি কার্যকরী নয়।

যেক্ষেত্রে কোন যান্ত্রিক কারণের জন্য পীড়া (affection due to some physical and mechanical cause) দেখা দেয় সেখানে হোমিওপ্যাথি প্রযোজ্য নয়। এসবই বাহ্যিক কারণের স্থুলস্তরে ক্রিয়াফল। হোমিওপ্যাথি ওষুধ অতীন্দ্রিয় স্তরে কাজ করে জীবনীশক্তির গুণগত পরিবর্তন সাধন করে। যেখানে জীবনীশক্তি অতীন্দ্রিয় স্তরে আক্রান্ত হয়না, হোমিওপ্যাথি সেখানে কার্যকরী নয়।

আকস্মিক কোন দুর্ঘটনার দরুণ যখন স্বাভাবিক প্রাণক্রিয়া রুদ্ধ ও স্থগিত থাকে এবং মৃত্যুসম্ভাবনা দেখা দেয়া তখন সেই জরুরী অবস্থায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কাজ করবার মতো সময় পায় না। তখন কোন উপশমদায়ক (palliative) ওষুধ প্রয়োগ দ্বারা বা অন্য কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করে অবিলম্বে প্রাণক্রিয়ার রুদ্ধগতি মুক্ত করতে হয়। তারপর যদি প্রকৃতই প্রাণসত্তা বা জীবনীশক্তি পীড়িত হয়ে থাকে তবে হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্র উপস্থিত হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই, কোন পীড়া নয়। প্রকৃত কারণটি এখানে বাহ্যিক।

যেক্ষেত্রে রোগের উদ্দীপক (exciting) ও পরিপোষক (maintaining) কারণ বর্তমান এবং ক্রিয়াশীল সেখানে হোমিওপ্যাথি কার্যকরী নয়। তবে উদ্দীপক ও পরিপোষক কারণ দূর করা গেলে হোমিওপ্যাথি কার্যকরী। যেমন- ঠান্ডা পানীয় পানে রোগের সৃষ্টি এটি একটি উত্তেজক কারণ বা অধিক মশলাজাতীয় খাদ্য খেলে রোগ বৃদ্ধি হয় এটি একটি পরিপোষক কারণ। অন্ততঃ চিকিৎসাকালীন রোগীকে এজাতীয় কারণ বর্জন করেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিতে হবে।

যেখানে ওষুধের ক্রিয়ার প্রতি রোগীর জীবনীশক্তির ক্ষমতা নিঃশেষিত, অবরুদ্ধ বা বিকৃত সে সব ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিতে উপশমপ্রদান (palliation) করা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই করবার থাকেনা।

জন্মগত বা অর্জিত দোষে বা অন্য কোন কারণে দৈহিক যে সমস্ত পীড়া বা দৈহিক বিকৃতি বা বিচ্যুতি দেখা দেয় যা সম্পূর্ণ শল্য-চিকিৎসার অন্তর্গত সে সমস্ত ক্ষেত্র হোমিওপ্যাথির ক্রিয়া পরিধির বাইরে। যেমন জন্মগত হৃদরোগ (congenital heart disease)।

উপরোক্ত গুটি কতক ক্ষেত্র ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি কার্যকরী। জীবনীশক্তির বিশঙ্খলা এবং সেই ক্রিয়ার দরুণ রোগীর ক্রিয়াগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রই হলো প্রকৃতপক্ষে হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্র। এ অবস্থা প্রকাশিত হয় রোগীর মধ্য বিশেষ, পরিচায়ক, বিরল লক্ষণাবলীর মাধ্যমে, যেখানে রোগলক্ষণাবলীর সুস্পষ্ট হ্রাস-বৃদ্ধি আছে। এক্ষেত্রে রোগের নাম যাই হোক না কেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকরী।

ডা. বেনজীর আহমেদ একজন কনসাল্টেন্ট হোমিওপ্যাথ। বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিশ্বব্যাপী প্রফেসর জর্জের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথের তালিকা দেখতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *