আজ লিখছি আমার পোস্টে বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। স্বাস্থ্য বিষয়ক টপিক এবং ব্যতিক্রমধর্মী কিছু বিষয়ে ফেসবুকে নিয়মিত লিখে ব্যাপক সাঁড়া পাচ্ছি। প্রধানত ৩ শ্রেণীর পাঠক আমার লেখা পড়েন, কমেন্ট ও শেয়ার করেন। আজ এই ৩ শ্রেণীর বন্ধুদের নিয়েই লিখবো। এরা হচ্ছেন- (১) হোমিওপ্যাথ (২) এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার (৩) সচেতন সাধারণ মানুষ।

প্রথমেই আসি হোমিওপ্যাথদের কথায়। এদের একটা অংশ যারা প্রকৃত অর্থে শুদ্ধ হোমিওপ্যাথির চর্চা করেন না তাঁরা না পারছেন সত্যকে গ্রহণ করতে পারছেন না পারছেন প্রতিবাদ করতে। কিন্তু আমারতো সত্যকে প্রকাশ করতেই হবে। যখন লিখছি একসময়ে একাধিক ওষুধ প্রয়োগ বিজ্ঞানসম্মত নয় তখন যারা ৫-১০-২০ টি ওষুধ, ট্যাবলেট, মাল্টিপল রেমিডি, হোমিও ভ্যাকসিন প্রেসক্রাইব করেন তাঁদের তো গাত্রদাহ হবেই। যখন লিখছি রোগীর যাবতীয় শারীরিক-আবেগিক-মানসিক রোগলক্ষণ সংগ্রহ করে একটি প্রতিচ্ছবি দাঁড় করাতে হবে এবং এই প্রতিচ্ছবির অনুরূপ একটি ওষুধের অনুসন্ধান করতে হবে যাতে গভীর অধ্যয়নের দরকার ও যা শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া -তখনতো তাঁরা কষ্ট পাবেনই। এরা ল্যাবটেস্ট নির্ভর হোমিওপ্যাথ, বড় বড় ল্যাব খুলে বসে আছেন। এরা এ্যালোপ্যাথের ন্যায় ১টি লক্ষণের জন্য একাধিক ওষুধ দিয়ে অভ্যস্ত। এ‌ই ওষুধ-কাম-ল্যাব ব্যবসায়ী দিনে ২০০-৩০০-৫০০ রোগী দেখে থাকেন। তাঁদের চেম্বারে মেডেল আর সার্টিফিকেটের ছড়াছড়ি। রোগীর সাথে কথা বলার সময়, সুযোগ, মানসিকতা কোনটিই তাঁদের নেই। অথচ বিশ্বসেরা হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের গ্রীসের এথেন্স ক্লিনিকে ৩০ জন হোমিওপ্যাথ মাসে ২২০০ রোগী দেখেন। প্রখ্যাত ভারতীয় হোমিওপ্যাথ ফারুক জে, মাষ্টার তাঁর ১৫/১৬ জন সহযোগী হোমিওপ্যাথের সাহায্য নিয়ে সারাদিনে ৭০-৭৫ জন রোগী দেখেন। আমার হিসেবে ২/৩ জন সহকারী হোমিওপ্যাথ থাকলে একজন হোমিওপ্যাথ দিনের ১০-১২ ঘন্টার প্রাকটিসে সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ বা বড়জোর ৫০ জন রোগী দেখতে পারেন। এদেশের হোমিওপ্যাথদের এত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কি করে হলো?

এরপর লিখি আধুনিক চিকিৎসার তথাকথিত ধারক (!) এ্যালোপ্যাথদের নিয়ে। তাঁরা নিঃসন্দেহে মেধা-মননে অধিকাংশ হোমিওপ্যাথের চেয়ে উত্তম। তাঁরা বিজ্ঞানমনষ্ক কিনা এ প্রশ্নের উত্তর পাঠকের উপরই ছেড়ে দিলাম। এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তাররা স্বভাবসুলভ কিছু মন্তব্য করেন। তাঁরা বিগ সাইজের ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, ইঞ্জেকশন দেখে অভ্যস্ত। তাঁরা বুঝতেই পারেন না হোমিওপ্যাথির সুক্ষ্ম ডাইলিউটেড ওষুধ ও তার ক্ষুদ্রতম ডোজ কিভাবে কাজ করে। আর তাঁরা যা বুঝেন না সেটি ১০০% অবৈজ্ঞানিক (?)। আমি প্রতিদিন এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারদের হাত হতে ১২ টা বাঁজিয়ে ফেরত আসা রোগী দেখছি। যুক্তিতে আসেনা কিভাবে একজন রোগীকে দিনে ১২ টি হতে ২০ টি ওষুধ সেবন করিয়ে সুস্থ করার দাবী করেন তাঁরা। আমার প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৫ হাজার মেডিকেল ডক্টর এ্যালোপ্যাথি ছেড়ে হোমিওপ্যাথি শুরু করেছেন। শুরুটা ছিল বিশ্বখ্যাত স্টানফোর্ড মেডিক্যাল স্কুল হতে ১৯৭২ সালে ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রীপ্রাপ্ত ডক্টর বিল গ্রের মাধ্যমে। তিনি জর্জ ভিথোলকাসের সান্নিধ্যে ৩ বছর কাটিয়ে চিরতরে এ্যালোপ্যাথি ছেড়েছিলেন। মেডিকেল স্কুলে ডক্টর বিল গ্রের সরাসরি শিক্ষকদের ৩ জন ছিলেন মেডিসিনে নোবেল বিজয়ী। এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ এতটাই বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত যে বিজ্ঞানের এই যুগে এখনও ইঁদুর, গিনিপিগ, বানর ইত্যাদির উপর ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেটি মানবের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষের আবেগ-মন ইত্যাদির কোন মূল্যই নেই। তাঁরা শুধু টেস্ট রিপোর্টের উপর (অবজেকটিভ লক্ষণাবলী) ভিত্তি করে প্রেসক্রাইব করে যাচ্ছেন। তাঁরা রোগীর মন, ইমোশন, অনুভূতির (সাবজেকটিভ লক্ষণের) ধারই ধারেন না। কি করে আশা করেন তাঁরা রুগ্ন মানুষকে সুস্থ করবেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কনসেপ্টটি কতটা বিজ্ঞানসম্মত? মানুষের দেহকে তাঁরা আর কতটা খন্ডিত করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার নামে বিশেষজ্ঞের তালিকা বাড়াতে থাকবেন? দেহই কি মানুষের একক পরিচয়? মনের-আবেগের কি কোনই স্থান নেই? স্বীকার করতে হবে সার্জারী আজ অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি ৯০% ক্ষেত্রে এই সার্জারী অপ্রয়োজনীয় ও রোগীর অবস্থা জটিল করে তুলছে।

এখন আলোচনা ফেসবুক ফ্রেন্ডদের কিছু মন্তব্য নিয়ে। অনেকে প্রশংসা করে ই-ইমেইল, মেসেজ করেছেন। তাঁদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমার প্রত্যাশা ছিল কিছু ইতিবাচক সমালোচনার। যাতে করে উত্তোরত্তর উন্নয়নের সুযোগটি পাই। আমি নিজে continuous education এ বিশ্বাসী। যে কারণে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ হোমিওপ্যাথের নিকট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েও থেমে যাইনি। চলছে মনোবিজ্ঞানে উচ্চতর কোর্সে অধ্যয়ন। দৈনন্দিন জীবনে এর অর্জিত জ্ঞান আমার কাজে লাগছে। এ শেখার শেষ নেই। দোয়া করবেন যেন আল্লাহ আমার সহায় হন।

কেউ কেউ প্রশ্ন রেখেছেন অনলাইনে আবার হোমিও চিকিৎসা কিভাবে? প্রসংগত, আমি আমার চিকিৎসা পেশার প্রথম দিন হতেই প্রযুক্তির ব্যবহার করে আসছি। বিগত ২৫-৩০ বছরে হোমিও জগতে প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকহারে বেড়েছে। তবে রোগলক্ষণ সংগ্রহ করাটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটি সূচারূরুপে করা গেলে ৫০% সফল। এরপরই প্রযুক্তির ব্যবহার। ম্যানুয়ালী ১টি কেস বিশ্লেষণে যেখানে কয়েক ঘন্টা-দিন লাগতো, তা এখন কয়েক মিনিটেই নির্ভুলভাবে সম্ভব। জীবনের সর্বত্র প্রযুক্তির ব্যবহার হলে হোমিওপ্যাথিতে নয় কেন?

কেউ কেউ জানিয়েছেন ১০০% গ্যারান্টি দিলেই তবে চিকিৎসা নেবেন। তাঁদের জন্য বলছি ১% গ্যারান্টিও দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ১০০% চেষ্টার প্রতিশ্রুতি রইলো ইনশাল্লাহ্। প্রতিটি ওষুধ মানবশরীরে প্রবেশের পর সেটি কাজ করবে কিনা সে ব্যাপারে মহান আল্লাহর অনুমতি চায়। দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাসটি আজীবন রাখতে চাই।

বহু বন্ধু কিছু রোগের নাম লিখে চিকিৎসা চেয়েছেন। সে বিষয়ে মন্তব্য করার আগে এটুকু পরিষ্কার করতে চাই যে ফেসবুকে লেখার প্রধান উদ্দেশ্য মানুষকে সতেচন করে তোলা; রোগী সংগ্রহ নয়। পদ্ধতিগত ভাবে ফেসবুকে চিকিৎসা পরামর্শ দেয়াও সম্ভব নয়। অলৌকিক ভাবে যদি আমার চেম্বারে ১০-২০-৩০ জন রোগী এসে হাজির হয় তা সামলাবার সামর্থ আমার নেই। আমি চাই হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে সত্যটি মানুষ জানুক এবং আমাকে না হলেও ভাল একজন হোমিওপ্যাথের দারস্থ হোক। আমি চাই মানুষ জানুক খারাপ জীবনযাত্রা প্রণালী, দমনমূলক চিকিৎসা ও টীকাদান, শারীরিক-আবেগিক-মানসিক আঘাত বা ট্রমা, খাবার-পানীয়-পরিবেশের ভেজাল, বংশগত রোগপ্রবণতা, বস্তুগত প্রাপ্তির জন্য ক্রমাগত দৌড় ইত্যাদি কারণে মানুষ কি মারাত্মক রকমের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে সে সম্পর্কে জেনে করণীয় নির্ধারণ করুক।

অনেক বন্ধু কিছু রোগে নাম উল্লেখ চিকিৎসা পরামর্শ চেয়েছেন। জবাবে বলতে চাই হোমিওপ্যাথি রোগ নয়; রোগীর চিকিৎসা করে। মানুষ রুগ্ন বলেই তাঁর নানা অংগে, মনে ও আবেগের ক্ষেত্রে নানা নামে নানা রোগ বাসা বাঁধে। কিন্তু আক্রান্ত হয় পুরো মানুষটিই। তাই পুরো মানুষটিকে আরোগ্য করতে পারলে রোগটি চর্ম-যৌন, যকৃত, কিডনী, হৃদযন্ত্র, শ্বাসযন্ত্র, পরিপাকতন্ত্রের রোগ বা হোকনা আবেগিক-মানসিক রোগ, তা আরোগ্য হবেই ইনশাল্লাহ্। বংশগত প্রবণতা, দমনমূলক চিকিৎসার ও খারাপ জীবনযাত্রার উপর নির্ভর করে রোগীর কেসটি কতটা পরিষ্কার। কেসটি যত বেশী পরিষ্কার, আরোগ্য ততোটা দ্রুত সম্ভব।

বন্ধুদের উল্লেখ করা কিছু রোগের নাম ও এ বিষয়ে আমার মন্তব্য এখানে উল্লেখ করছি, যেমনঃ

(১) নাকের পলিপ, টনসিল, ঠান্ডা-সর্দির সমস্যা কোনটিই সার্জারীর চিকিৎসা নয়। সার্জারী করলে ভবিষ্যতে কঠিন শ্বাসতন্ত্রের রোগ যেমন হাঁপানী-নিউমোনিয়া-যক্ষ্মায় ভুগতে হবে। দেখা দেবে নানা সময় এ্যালার্জিক সমস্যা।

(২) অর্শ্ব বা পাইলস্, ফিসার, ফিসচুলা, ফোঁড়া, রক্তপাত ইত্যাদির সার্জারী আপনাকে অনতিবিলম্বে হৃদরোগীতে রুপান্তর করবে। তেমনিভাবে আঁচিল, লাইপোমা, টিউমার, হার্ণিয়া অপারেশন করলে তা গভীর অংগকে আক্রান্ত করবেই। অপারেশনে রোগটি আরোগ্য হয়েছে মনে হলেও এটি পুনরায় হবার প্রবণতাতে ধ্বংস করা যায়না। কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, আমাশয়ের চমৎকার হোমিও চিকিৎসা আছে।

(৩) জন্ডিস, হেপাটাইটিস, পিত্তপাথর, গ্যাসের সমস্যা, আইবিএস, কিডনী স্টোন, সিস্টাইটিস কোন বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। কেসটি পরিষ্কার থাকলে আরোগ্য হবে ইনশাল্লাহ।

(৪) ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সার বংশগত প্রবণতা ও জীবনযাত্রার সাথে সম্পৃক্ত। এগুলোকে শুধু নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করলে রোগীর জটিলতাই বৃদ্ধি পাবে দিন দিন। চাই পুর্ণাংগ চিকিৎসা।

(৫) পুরুষ ও মহিলাদের নানা রকম যৌন সমস্যা, বন্ধ্যাত্ব্যের নিরাময়ে মন-আবগের প্রাধান্য দিতেই হবে। কারণ খুঁজে তা দুর করতে হবে। জীবনাযাত্রায় পরিবর্তন অত্যাবশ্যক।

(৬) ত্বকের সমস্যা বিশেষত, ভিটিলিগো, সোরাইসিস, এ্যালার্জিক সমস্যা, রিং ওয়ার্ম, একজিমা ইত্যাদির এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা অর্থাৎ ষ্টেরয়েড,কর্টিজন ইত্যাদি ব্যবহার প্রকারন্তরে রোগীর কিডনী, যকৃত ও ফুসফুস ও হৃদপিন্ডকে আক্রান্ত করে।

হোমিওপ্যাথি হলিস্টিক চিকিৎসা যেখানে প্রতিটা রোগীর প্রধান লক্ষণের পাশাপাশি আনুষংগিক লক্ষণ ও যাবতীয় মেন্টাল-ইমোশনাল লক্ষণাদির সমন্বয়ে একটি পূর্ণাংগ কেস প্রস্তুত করে – পুরো রোগীকেই আরোগ্য করার চেষ্টা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.