রোগের কারণ হিসেবে লাইফস্টাইল (Lifestyle as causative factors of diseases): রোগীর ব্যক্তিগত মেডিক্যাল হিস্ট্রিতে আমরা তার অতীতের এমন ঘটনার অনুসন্ধান করি যা রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছিল বা এখনো করে যাচ্ছে। এটি এমন বিষয় যা রোগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলে। একেই রোগের প্রকৃত কারণ বা causative factor বলে। রোগীর জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর একটি কালানুক্রমিক (chronological) বিবরণ রাখা জরুরী। হোমিওপ্যাথের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমেই হোমিওপ্যাথ রোগীর জীবনে কি ঘটে গেছে সে বিষয়ে একটি অন্তর্দৃষ্টি বা insight লাভ করেন। রোগীর জীবনে কখন কোন্ ওষুধের চিত্র এসেছিল এবং সে কি কি স্তর অতিক্রম করে বর্তমান অবস্থায় এসেছে তা জানা দরকার। মেডিক্যাল হিস্ট্রির মাধ্যমেই হোমিওপ্যাথ রোগী সম্পর্কে মোটামুটি একটি হিসেব বা estimate পেতে পারেন, কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে রোগদমন বা suppression হয়েছে তা জানতে পারেন। অধিকন্তু ওষুধ প্রয়োগের পর আরোগ্যের নীতি অনুযায়ী কিভাবে পুরাতন রোগলক্ষণের পুনঃপ্রকাশ হয় এবং শেষ পর্যন্ত রোগী পুর্ণাংগরূপে আরোগ্য হয় তার ব্যাখ্যাও পেতে পারেন।

কজেটিভ ফ্যাক্টরের ধারাবাহিক আলোচনায় আজ থাকছে জীবনযাত্রা প্রণালী (lifestyle)। মানুষের জীবনযাত্রার যে বিষয়গুলি তার রোগের কারণ হয় বা রোগলক্ষণটিকে জিইয়ে রাখে চিকিৎসা শুরু করার পূর্বে সেগুলিকে সমন্বয় বা সংশোধন করতে হবে। এটি রোগের খুব সাধারণ নিজন্ত কারণ বা causative factor। কারণ, অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যেমেই একে সংশোধন করা যায়। রোগের অন্য ৪টি কারণের ক্ষেত্রে যা প্রায়শই অসম্ভব। ঐ ৪টি কারণ হচ্ছে- (১) শারীরিক, আবেগিক, মানসিক আঘাত (physical, emotional, mental trauma) (২) রোগদমনমূলক চিকিৎসা ও টীকাদান (suppressive therapies and vaccinations), (৩) তীব্র সংক্রামক রোগ (acute infectious diseases) এবং (৪) বংশগত প্রবণতা (hereditary predisposition)।

আমরা অনেক সময় দেখতে পাই কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীর জীবনধারার কোন কোন বিষয় নিজেই একটি রোগলক্ষণ হয়ে দাড়ায়। এক্ষেত্রে রোগী আর এটাকে পরিবর্তন করতে পারেনা। উদাহরণস্বরূপ মদ্যাশক্তি (alcoholism), নানা রকমের আসক্তি বা নেশা (addictions), ক্ষুধাহীনতা বা ক্ষুধামান্দ্য (anorexia) ইত্যাদি।

এটি অনস্বীকার্য যে, যে বিষয়গুলি রোগকে পুষে/জিইয়ে রাখে (maintaining cause) তাকে চিকিৎসা গ্রহণের আগে পরিহার (eliminate) করতেই হবে। এটি অসম্ভব হলে রোগী আরোগ্যের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কমে যাবে।

লাইফস্টাইল ডিজিজ এর আরও কিছু নাম আছে যেমন, দীর্ঘায়ু রোগ (diseases of loggevity) বা সভ্যতার রোগ (diseases of civilisation)। যে সব রোগকে লাইফস্টাইল ডিজিজ বলে থাকি এমন কিছু রোগ হচ্ছে- অ্যালঝাইমার্স ডিজিজ, আথ্রাইটিস, এ্যাথেরোস্কেলোরিসস, এ্যাজমা, ক্যান্সার, ক্রণিক লিভার ডিজিজ বিশেষত সিরোসিস, অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারী ডিজিজ, টাইপ-২ ডায়বেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, মেটাবলিক সিনড্রোম, ক্রণিক রেনাল ফেইলুর, অস্টিওপরোসিস, ডিপ্রেশন, ওবেসিটি ইত্যাদি।

লাইফস্টাইল একটি অত্যন্ত বৃহৎ বিষয়। জীবনযাত্রার যে সকল বিষয়ের কারণে উপরোক্ত রোগগুলি হয়ে থাকে তার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো যা রোগের মেইনটেইনিং কারণ হিসেবে কাজ করে অর্থাৎ রোগটিকে জিইয়ে রাখে।

(১) অস্বাস্থ্যকার খ্যাদ্য-পানীয়,

(২) শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বা sedentary lifestyle,

(৩) অহেতুক মানসিক চাপ ও উদ্বেগ,

(৪) ধুমপান, ড্রাগস্ সেবন, মদ্যপান,

(৫) বাসস্থানের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ,

(৬) খারাপ কর্ম পরিবেশ যেমন- খুব ভারী বা অস্বাস্থ্যকর কাজ বা যে কাজে অনাগ্রহী এমন কাজ,

(৭) পারস্পারিক খারাপ সম্পর্ক (দম্পতি, পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, বন্ধুদের সাথে),

(৮) অনৈতিক যৌন সম্পর্ক, পর্ণোগ্রাফিতে আসক্তি,

(৯) প্রযুক্তির অহেতুক ব্যবহার, বিশেষত বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানো,

(১০) বস্তুগত অর্জনকে অধিক গুরুত্ব দেয়া এবং তার জন্য সকল প্রচেষ্টা নিঃশেষ করে ফেলা ইত্যাদি।

উপরোক্ত বিষয়গুলি এমন কঠিন চাপ (stress) সৃষ্টি করে যাতে রোগী ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হোমিওপ্যাথির জনক ডক্টর হ্যানিম্যান তাঁর ক্রণিক ডিজিজেজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আবেগিক প্রচন্ড চাপের কারণেও মানুষ রোগকে পুষে রাখে।

কিন্তু যদি রোগীর এই আবেগিক সম্পর্কটিকে উন্নত না করা যায়, তার যদি এটাকে ধৈর্য সহকারে মোকাবেলার যথেষ্ট দর্শন, ধর্ম ও শক্তি না থাকে এবং যদি মনের স্থিরতা (equanimity), দুঃখ কষ্ট (afflictions) এর জন্য যদি তাকে দায়ী না করা যায় এবং পরিবর্তন করার শক্তি যদি তার না থাকে; যদি বিষাদ বা মর্মযন্ত্রণা এবং বিরক্তি, হয়রানি অনবরত তার উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং চিকিৎসকের পক্ষে যদি রোগীর এসব সক্রিয় ধ্বংসাত্মক উপাদান সরিয়ে ফেলার ক্ষমতা না থাকে তবে চিকিৎসককে চিকিৎসা ত্যাগ করাই ভাল এবং রোগীকে তার ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয়া উচিত।

এজাতীয় কেস যতই পরিষ্কারভাবে দৈহিক লক্ষণের জন্য ওষুধ প্রদর্শন করুক না কেন, যত সুন্দরভাবেই কেসটি ম্যানেজ করা হোকনা কেন, ফলাফল শুণ্য। ক্রণিক রোগীটি ক্রমাগত দুঃখবোধ, বিরক্তি প্রকাশ করবে। কারণ রোগীর ব্যক্তিসত্ত্বায় অনবরত ধ্বংসাত্মক আক্রমন হয়ে যাচ্ছে। এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া বোকামী কারণ ভিত্তিটিকেই দৈনন্দিন খাটো করে ফেলা হচ্ছে।

জীবনযাত্রার উল্লেখিত বিষয়গুলি রোগীর উপর স্ট্রেসার হিসেবে প্রদর্শিত হয় এবং যা তার এনার্জি কমপ্লেক্সটিকে ব্লক করে দিতে পারে এবং এভাবে মানবের সার্বিক এনার্জি লেভেলটিকে নিচে নামিয়ে আনে। এটা তখন প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারীতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। কারণ প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে কাজ করার জন্য এনার্জি কমপ্লেক্সের উপর নির্ভর করে। যখন প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি দুর্বল হয়ে যায়, মানবদেহ তখন একিউট ও ক্রণিক রোগের আক্রমণ হতে আর সুরিক্ষত থাকে না। হোমিওপ্যাথিতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে লাইফস্টাইল ডিজিজের সফল চিকিৎসা সম্ভব। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীকে কাউন্সেলিং ও জরুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *