কটি না একাধিক ওষুধ? হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত যা বিগত ২ শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে স্ব-মহিমায় টিকে আছে। অন্যান্য প্রাকৃতিক নিয়মের মতই এটি অপরিবর্তনীয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা একদিকে কোন প্রকার নিয়মনীতির ধার ধারেনা অন্যদিকে তা নিত্যই পরিবর্তনশীল।
সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকা সত্ত্বেও মুষ্টিমেয় কিছু হোমিওপ্যাথ এবং কিছু ফার্মেসী ভিন্ন গতিতে চলমান। তারা কম্বিনেশন ও সুনির্দিষ্ট মেডিসিনে (combination & specific medicine) বিশ্বাসী। তাদের কাছে হোমিওপ্যাথিক হেয়ার অয়েল, হোমিওপ্যাথিক লোশন, ট্যাবলেট, টিকা, এমনকি ইন্জেকশনও রয়েছে। সত্য বলতে হোমিওপ্যাথির সাথে এর কোনই সম্পর্ক নেই। হোমিওপ্যাথি একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটিমাত্র ওষুধ প্রদানে বিশ্বাসী।
সহজ উপায়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম কিছু ফার্মেসী আজ কম্বিনেশন ও স্পেসিফিক রেমিডির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর কিছু হোমিওপ্যাথ হোমিওপ্যাথি না বুঝে, আত্মবিশ্বাস ও সামর্থের অভাবহেতু এই কম্বিনেশন ও স্পেসিফিক রেমিডির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। তাদের একমাত্র অজুহাত হচ্ছে ”এগুলো তো কাজ করছে”। বাস্তবে কম্বিনেশন ও স্পেসিফিক রেমিডি কাজ করে কিনা সে বিষয়টির কোন বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ নেই। কারণ সুস্থ মানবদেহে একই সময়ে একটি মাত্র ওষুধই প্রমাণ করা হয়েছে এবং তার লক্ষণাবলী মেটেরিয়া মেডিকাতে সন্নিবেশিত হয়েছে। একটি মানবদেহে একই সময়ে একাধিক ওষুধ প্রমাণ করার কোনই সুযোগ নেই এবং তা বিজ্ঞানসম্মতও নয়। কারণ একই মানবদেহে একই সময়ে একাধিক ওষুধের প্রয়োগ করে কোন ওষুধে কি লক্ষণ সৃষ্টি করে তা পৃথকভাবে রেকর্ড করার কোন বিজ্ঞানসম্মত উপায়ই নেই, ভবিষ্যতেও হবেনা। তবে হ্যাঁ, কম্বিনেশন ও স্পেসিফিক রেমিডি যে কাজটি করে তা হচ্ছে রোগের আপাত কিছু উপশম এবং দীর্ঘমেয়াদে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ন্যায় রোগলক্ষণ চাপা দেয়। ফলতঃ রোগীর কেসটি জটিল ও অনারোগ্য হয়ে যায়। অতএব যে সকল হোমিওপ্যাথ একাজটি করে যাচ্ছেন তারা নিঃসন্দেহে হাতুড়ে ডাক্তার (quack)। তারা হোমিও নিয়মনীতি, হোমিও দর্শন তথা হোমিও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ধার ধারেন না। তারা আজ ব্যস্ত চিকিৎসক!
মহাত্মা হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের জন্য একটি মৌলিক যোগ্যতা নির্ধারণ করে গেছেন। এটি হলো কখনও একজন হোমিওপ্যাথ রোগীর জন্য এমন কোন ওষুধ প্রয়োগ করবেন না – যা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সুস্থ মানবদেহে প্রয়োগ করে (proving) লক্ষণাবলী মেটেরিয়া মেডিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়নি এবং যার জ্ঞান ঐ চিকিৎসকের নেই।
”কম্বিনেশন ও স্পেসিফিক ওষধের হরেক রকমের উপকারিতা আছে” – এজাতীয় জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে কিছু বিশ্বহোমিওপ্যাথিক প্রেমিক আজ সেগুলি প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। অপেক্ষা করুন অচিরেই আপনার রোগী আপনার উপর আস্থা হারিয়ে আপনাকে ত্যাগ করবেন। কারণ আপনি তাকে আরোগ্যদানে ব্যর্থ। আপনি হোমিওপ্যাথিক নিয়মনীতির ধার ধারেননি। সফলতা তাই আপনার কাছে ধরা দেয়নি।
হাতুড়ে হোমিওপ্যাথের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। কারণ, ক্ল্যাসিক্যাল হোমিওপ্যাথ এখন বিলুপ্ত প্রায়। জেট বিমানের এই যুগে আমরা ইনষ্ট্যান্ট চা, রক মিউজিকের মত ইনষ্ট্যান্ট ও কুইক রিলিফে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। এখন খোঁজা হয় তেমন ডাক্তার যিনি রোগীকে তাৎক্ষণিক উপশম দিতে পারবেন। আর ডাক্তার চান বিনাশ্রমে দ্রুত অধিক অর্থ উপার্জন করতে। ক্ল্যাসিক্যাল হোমিওপ্যাথির জন্য প্রয়োজন সৎ, হোমিও নিয়ম নীতি দর্শনে অবিচল ও দৃঢ়, কঠোর পরিশ্রমী এবং ধৈর্যশীল চিকিৎসকের যা অতীতে অনেক দেখা যেত। আজকের হোমিওপ্যাথ খোঁজেন সহজ ও দ্রুততম পদ্ধতি। ফলত ইনষ্ট্যান্ট উপশমের নামে রোগলক্ষণ চাপা দেয়া হচ্ছে। আর আরোগ্যের ধারণাটিই ডাক্তারের নিকট অস্পষ্ট। যত দ্রুত রোগ চাপা দেয়া হচ্ছে, ততো দ্রুত তা পুনঃপ্রকাশিত হচ্ছে আর রোগীর কষ্ট বেড়েই চলেছে। হোমিওপ্যাথি যে দ্রুত, নির্মল ও স্থায়ী আরোগ্য করে এ জাতীয় হোমিওপ্যাথেরা তার অভিজ্ঞতা কখনই পাচ্ছেন না। প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথ কেন্ট বলেছেন, ”কখনই দ্রুততার সাথে ক্রণিক রোগীর জন্য ব্যবস্থাপত্র দেবেন না, সময় নিন। কখনও রোগীর কেসটি সার্বিকভাবে ও সম্পূর্ণরূপে বিবেচনা না করে তাকে এক ডোজ ওষুধও সেবন করাবেন না।”
একটি রোগলক্ষণের জন্য ওষুধপ্রয়োগ কখনও সঠিক নয়। অগভীরভাবে ওষুধের সাথে রোগলক্ষণের সামঞ্জস্য খুজে বের করাটা মোটেই যথেষ্ট নয়। আজ এক জাতীয় লক্ষণের জন্য ওষুধপ্রয়োগ আবার আগামীকাল আরেক প্রকার লক্ষণের জন্য ওষুধপ্রয়োগ রোগীর জন্য ক্ষতিকর। রোগীর কেসটি এতে জটিলরূপ ধারণ করে ও অনারোগ্য হয়ে পড়ে।
আজ ক্ল্যাসিক্যাল হোমিওপ্যাথের বড় প্রয়োজন। এখানে অনুমান নির্ভরতার কোন সুযোগ নেই, তা বিজ্ঞানসম্মতও নয়। সবকিছুই চলবে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। যুগ পাল্টেছে বলে বিশৃংখলতার সাথে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ প্রয়োগ করে তাকে বিজ্ঞানসম্মত দাবী করার কোনই সুযোগ নেই। হোমিওপ্যাথিক বিজ্ঞান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও যুক্তির আশ্রয় না নিয়ে হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করাটা হোমিও বিজ্ঞানের প্রতি অবিচার।
দুঃখের সাথে বলতে হয় হোমিওপ্যাথেরা আজ দ্বিধাবিভক্ত। বস্তুগত স্বার্থের কারণে। রোগীকে না বুঝে অগভীরভাবে কেস টেকিং ও কুইক প্রেসক্রিপশন কিছু ডাক্তারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এভাবেই একটি কেসকে বিকৃত করে ফেলা হচ্ছে। হোমিও নিয়মনীতি আমাদের শেখায় রোগলক্ষণ চাপা দেয়া পরিহার করতে। রোগীকে স্বাস্থ্যে পুনরুদ্ধারের চিন্তা না করে নীতির সাথে আপোষ কখনই কাম্য হতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.