fbpx

কানের চিকিৎসায় অলৌকিক সাফল্য

কানের চিকিৎসায় অলৌকিক সাফল্য

আজ লিখছি আমার নিজের কানের সমস্যা ও তার চিকিৎসা নিয়ে। গত ১৮ মার্চ সন্ধ্যা ১০১৬, সন্ধ্যা ৬:৩৫ এ হঠাৎ করে আমি আমার বাম কানের শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলি। ঐ সময় আমি আমার চেম্বারে রোগী দেখছিলাম। এ ঘটনার পরই আমার প্রচন্ড রকমের মাথা ঘোরাতে শুরু করে এবং কানের মধ্যে নানা রকম শব্দ হতে থাকে যাকে কানের ডাক্তারেরা টিনিটাস বলে থাকেন। প্রধানত আমার সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের চাপে আমি ২৩ মার্চ ২০১৬ কানের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রফেসর প্রাণ গোপালের শরণাপন্ন হই। তিনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি মন্তব্য করলেন, ”বাম কান ১০০% ডেড” এবং ”শ্রবণশক্তি আর ফিরবে না”। কারণ জিজ্ঞেস করাতে তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। যাহোক তিনি আমাকে ৬ প্রকারের ওষুধ দিনে তিনবার করে ৩ মাস সেবনের উপদেশ দিয়ে বিদায় দিলেন। তাঁর ডায়াগনসিসটি ক্রসচেক করার জন্য আমি সাভারের এনাম মেডিকেলে ইএনটি’র সহকারী অধ্যাপক  ডা. জামানের কাছে যাই। তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আমার বিষয়টি দেখেন এবং আবার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একই মন্তব্যে আসেন। শেষে আমাকে তার প্রফেসর ডা. আবুল হাসনাত জোয়ারদারের (মডার্ণ ডায়াগনসটিক) নিকট রেফার করেন। ডা. জোয়ারদারের নিকট হতেও একই জাতীয় মন্তব্য শুনে এবং আমার বন্ধু ড. ওমর ফারুক, উপ-সচিব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে আমি এই ৩ জন ডাক্তারের মন্তব্য এবং টেস্ট রিপোর্ট প্রখ্যাত ভারতীয় ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডা. অনির্বাণ বিশ্বাসের নিকট তার পরামর্শ চেয়ে প্রেরণ করি। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেন, “You are having either a viral labyrinths or a small stroke in the blood vessel that supplies blood to the ear. The ear houses – the balance organ as well as the hearing organ – Both are damaged. The damage is usually IRREVERSIBLE”.  আমার স্ট্রোক হয়েছিল কিনা তা দেখার জন্য ডা. জোয়ারদারের পরামর্শমতে আমার এমআরআই করানো হয়। সে রিপোর্ট সম্পূর্ণ নরমাল ছিল।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ইএনটি বিশেষজ্ঞরা আমার মাত্র ৩টি সমস্যার দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করেন। সেগুলো হলোঃ (১) শ্রবণশক্তিহীনতা (loss of hearing/deafness) (২) কানের শব্দ (tinnitus) এবং (৩) মাথাঘোরা (vertigo)। তারা আমার মানসিক-আবেগগত বিষয়গুলি বা আমার কষ্ট সম্পর্কে কোন কিছুই জানতে চাননি। তারা ব্যস্ত ছিলেন আমার কান নিয়ে; আমাকে নিয়ে নয়। অনেকটা হতাশাগ্রস্থ হয়ে আমি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণের চিন্তা করি। কিন্তু্ আমাকে চিকিৎসা দেবেনই বা কে? নিজের অসুস্থতা নিজেই চিকিৎসা করা অনেকটা কঠিন। তাই আমি শরণাপন্ন হলাম আমার প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের নিকট। তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল এ্যাকাডেমি অব ক্ল্যাসিক্যাল হোমিওপ্যাথি, গ্রীসের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পরামর্শ দিলেন। তার পরামর্শমত আমি আমাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করি এবং আমার যাবতীয় দৈহিক-মানসিক লক্ষণাবলী লিপিবদ্ধ করতে থাকি। কাজটি ছিল আমার জন্য আসলেই চ্যালেঞ্জিং। নিজের সাথে নিজের কথোপকোথন কতই না জটিল। সর্বশেষে আমি মোট ১২টি লক্ষণ বাছাই করি এবং অনলাইন সফটওয়্যার ভিথোলকাস কম্পাস (ভিসি) এর মাধ্যমে সেগুলো বিশ্লেষণ করি। লক্ষণগুলি ছিল নিম্নরূপঃ

1.       মানসিক – সার্বক্ষণিক চিন্তামগ্নতা, চিন্তায় ডুবে থাকা (absorbed, buried in thought)

2.      মানসিক – স্বাস্থ্য নিয়ে দুঃচিন্তা (anxiety about health)

3.      মানসিক – অন্যকে নিয়ে উদ্বিগ্নতা (full of cares about others)

4.       মানসিক – অস্থিরতা, নার্ভাসনেস (restlessness, nervousness)

5.      মানসিক – সংবেদনশীলতা, শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা (sensitive, oversensitive to noise)

6.      কান – কানে বুজ বুজ শব্দ (noises in the ear – buzzing)

7.      কান – কানে শব্দ, সাথে মাথাঘোরা (noises in the ear, with vertigo)

8.      চোখ – চোখের পাতা পিট পিট করা (twitching of lids)

9.      মুখমন্ডল – পিটপিট করা (twitching)

10.   সাধারণ – সন্ন্যাসরোগ (apoplexy means – unconsciousness or incapacity resulting from a cerebral hemorrhage or stroke)

11.   সাধারণ – স্নায়বিক অভিযোগ (Neurological complaints)

12.   শ্রবনশক্তি – কানবন্ধভাব সহ শ্রবণশক্তিহীনতা (Hearing – lost – with stopped sensation)

উপরোক্ত লক্ষণাবলী বিশ্লেষণ করে এবং কাছাকাছি ওষুধগুলি তুলনামূলক অধ্যয়ন শেষে আমি ককুলাস ইন্ডিকাস নামক ওষুধটি সেবন করি।

এখানে উল্লেখ্য, আমি প্রচন্ড রকমের মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম কর্মস্থলে, চেম্বারে রোগী দেখতে। এছাড়া একটি নিয়মিত অনলাইন কোর্সে অধ্যয়নের চাপ ছিল অতিরিক্ত। আমি ৩-৪ ঘন্টার বেশী ঘুমাতে পারছিলাম না। তাছাড়া আমি আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়েও দুঃচিন্তগ্রস্থ ছিলাম। কারণ ব্যস্ততার কারণে আমি তাদের সময় দিতে পারতাম না, তাদের প্রতি মনোযোগী হতে পারছিলাম না।

যাহোক, ওষুধ সেবনের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আমার মারাত্মক মাথাঘোরা ৯০% হ্রাস পায়। আমার ঘুমের কিছুটা উন্নতিও লক্ষ্য করি। এক সপ্তাহের মধ্যে কানের ভিতরকার শব্দের পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। কানের অভ্যন্তরে তখন বুজ বুজ শব্দের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে পাখির কিচির-মিচির শব্দ, নানা রকম ঘন্টার ও বাঁশির শব্দ, ঝরণার পানিপ্রবাহের শব্দ, এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ শুনছিলাম। শব্দগুলো ছিল অত্যন্ত তীব্র ও অসহনীয়। তাছাড়া বাইরের যেকোন শব্দই কানে খুব অসহ্য লাগছিল। কানটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়লো। তবে বন্ধ কান খুলে যাওয়াটাকে আমি খুব ইতিবাচক ভাবে নিয়েছিলাম। আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল কানটি কোন প্লাগ এঁটে বন্ধ করা হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন লক্ষণাবলী নিয়ে আবারও আমার কেসটি ভিসির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে বসলাম। এবার থেরিডিয়ন নামক ওষুধটি পরিষ্কারভাবে উপরে উঠে এলো। এটি সেবন করলাম। এরপর প্রতিদিন আমি একটু একটু করে সার্বিকভাবে ভাল অনুভব করতে লাগলাম। শব্দগুলি একে একে বন্ধ হতে লাগলো। ৬ সপ্তাহের মধ্যে আমি সার্বিকভাবে আরোগ্য লাভ করলাম। শ্রবণশক্তি পূর্ণরূপে ফিরে এলো। আহ্ কি বিস্ময়কর আরোগ্য!! আলহামদুলিল্লাহ্। সকল প্রশংসা সর্বশক্তিমান আল্লাহর।

  • লিখেছেন ডা. বেনজীর
  • আপডেট : ডিসেম্বর ১২, ২০১৬
  • 0 মন্তব্য
  • 1 লাইক

0 মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা দেখানো হবে না, আবশ্যক ঘরগুলো তারকা(*) চিহ্নিত |

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!