হোমিও চিকিৎসা সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জিং কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী। অন্য যেকোন চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনায় এখানে সঠিক ওষুধ নির্বাচন করাটা সুকঠিন।  হোমিওপ্যাথের ন্যায় রোগীর দায়িত্ব অপরিসীম। কারণ হোমিওপ্যাথ ল্যাব টেষ্টের উপর নয়; রোগীর কথার উপর অধিক গুরুত্ব দেন। দেখা যাক রোগীর কি কি দায়িত্ব আছেঃ

1.       রোগলক্ষণাবলী রুগ্ন জীবনীশক্তির বহিঃপ্রকাশ আর এই লক্ষণাবলীর উপর ভিত্তি করেই হোমিওপ্যাথ প্রেসক্রিপশন দেন। রোগীর প্রধান দায়িত্ব দৈনন্দিন জীবনের খুটিনাটি বিষয়কে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা ও প্রেসক্রিপশনের জন্য লক্ষণাবলী সুনির্দিষ্ট হ্রাস-বৃদ্ধি সহ উল্লেখ করা।

2.      স্বল্প সংখ্যক লক্ষণের উপর ভিত্তি করে প্রেসক্রাইব করা কঠিন। রোগীকে মনে রাখতে হবে যে তিনি সবার থেকে আলাদা। রোগীর মূল দায়িত্ব হচ্ছে তার শরীর, মন ও আবেগের ক্ষেত্রে কোন্ ধরণের পরিবর্তন বা বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেগুলি হোমিওপ্যাথের নিকট রিপোর্ট করা। এ্যালোপ্যাথের মত হোমিওপ্যাথ শুধু শারীরিক ক্ষেত্রে চিকিৎসাকে সীমাবদ্ধ রাখেন না। রোগীর সাথে অন্যের পারষ্পারিক সম্পর্ক, কাজের চাপ, পরিবেশগত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, খাবার-পানীয় পছন্দ-অপছন্দ, যৌন আকাংখা, ঘুমের গুণগত মান, তাপমাত্রার তারতম্যের প্রভাব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।

3.      রোগ নির্ণয় ও ওষুধ নির্বাচনের জন্য ক্ষুদ্র অথচ বিরল, অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য মন্ডিত বিষয় তাৎপর্যপূর্ণ। যেমনঃ একজন আলসারেটিভ কোলাইটিসের রোগী সর্বদাই উদ্বিগ্ন বিশেষত ভবিষ্যতের বিষয়ে, তিনি সামান্য শব্দেই চমকে উঠেন, শুধুমাত্র ডান পার্শ্বে শয়নে তার নিদ্রা আসে, অতিরিক্ত লবন খাওয়ার প্রবণতা ইত্যাদি। এ্যালোপ্যাথের নিকট এগুলোর কোন মূল্য না থাকলেও আরোগ্যদায়ক ওষুধ নির্বাচনে হোমিওপ্যাথকে এজাতীয় বিষয় অনেক সহায়তা করে।

4.       রোগীর আরেকটি দায়িত্ব ধৈর্যহীন না হওয়া বিশেষ করে ক্রণিক রোগের ক্ষেত্রে। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার অধীনে ব্যথানাশক ওষুধ, ট্যাঙ্কুইলাইজার, কর্টিজন, এ্যান্টিবায়োটিক, ষ্টেরয়েড ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা হলে ঐ রোগী হোমিও চিকিৎসায় তাৎক্ষণিক উপশম আশা করতে পারেনা। কারণ হোমিওপ্যাথি পুরো মানুষটির আরোগ্য নিয়েই চিন্তা করে। লক্ষ্য হচ্ছে রোগী যেন শারীরিক, মানসিক, আবেগীক সকল ক্ষেত্রে সুন্দর সমন্বয়ের মাধ্যমে সকল কার্যাবলী সুচারূরূপে সম্পন্ন করতে পারে। তাই রোগীর সুস্থতা অর্জন করতে রোগীভেদে কয়েক সপ্তাহ হতে কয়েক মাস এমনকি বছরও লাগতে পারে। রোগীর কেস স্বচ্ছ থাকলেই মিরাকেল কিউর সম্ভব। একথা সত্য অনেক এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীকে সারাজীবন ওষুধ খেতে হয়, যার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় রোগী একটির পর একটি নতুন রোগে আক্রান্ত হন। হোমিওপ্যাথি এমনটি নয়।

5.      রোগীকে জানতে হবে যে, সত্যিকার আরোগ্য কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, চিকিৎসার শুরুতে জীবনীশক্তির অবস্থা (strength of vital force)। জীবনীশক্তি খুব শক্তিশালী হলে ১টি ওষুধেই নাটকীয়ভাবে কাজ করে আবার তা দুর্বল হলে আরোগ্য হতে দীর্ঘ সময় লাগে। দ্বিতীয়ত, রোগীকে আরও জানতে হবে যে, জীবনীশক্তির এই অবস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে তার বংশগত রোগ প্রবণতার উপর। পূর্ব পুরুষের ক্রণিক রোগ থাকলে সে রোগী আরোগ্য অধিক সময় লাগবেই। তৃতীয়ত, রোগীর অতীত রোগভোগ এবং তার কারণে অধিক দিন ধরে সাময়িক উপশমদায়ক ও রোগদমনমূলক এ্যালোপ্যাথিক ওষুধে অভ্যস্ত থাকলে তাদের বিষয়টি জটিল ও সময়সাপেক্ষ। চতুর্থত, রোগী যদি অধিক সময় ধরে ক্রমাগত অপুষ্টিতে ভোগেন, নিয়মিত শরীরচর্চা না করেন, ধুমপান, মদ্যপান, অন্য ড্রাগে-নেশায় অভ্যস্ত থাকেন তবে দীর্ঘ সময় লাগবে। রোগীর দায়িত্ব এসব দিকে খেয়াল রেখে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা।

6.      কিভাবে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ রোগীকে যত্ন সহকারে সময় দিচ্ছেন, গলদঘর্ম হয়ে তার কেস বিশ্লেষণে বিস্তারিত অধ্যয়ন করছেন তা দেখে রোগীর খুশী হওয়া উচিত। রোগীর নিজের স্বার্থেই হোমিওপ্যাথকে সার্বিক সহযোগিতা করা উচিত। এখানে রোগীর ধৈর্যহারা হওয়া বা সন্দেহপ্রবণতা কাম্য নয়। তবে যে হোমিওপ্যাথ ঘন্টায় ৩০-৪০ জন রোগী দেখেন তার বিষয়টি ভিন্ন। বিশ্বসেরা হোমিওপ্যাথ জর্জ ভিথোলকাসের ক্লিনিকে ৩০ জন হোমিওপ্যাথ মাসে ২২০০ রোগী দেখেন। অর্থাৎ একজন হোমিওপ্যাথ মাসে ৭৩-৭৪ জন রোগী দেখেন।

7.      রোগলক্ষণাবলী শারীরিক, আবেগীক, মানসিক কোন স্তরে কতটা গভীরভাবে ক্রিয়াশীল তার উপরও আরোগ্যেকাল নির্ভর করে। রোগী যদি শুধু শারীরিক স্তরে রোগভোগ করে তবে তা স্বল্প সময়ে আরোগ্যযোগ্য, কিন্তু যদি তা একাধিক স্তরে বিরাজমান থাকে তবে অধিক সময় লাগবেই। জীবনীশক্তি সর্বদাই চেষ্টা করে রোগকে শারীরিক প্রান্তদেশে সীমিত রাখতে। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় প্রতিটি রোগ গভীর অংগ প্রত্যঙ্গে এবং এমনকি আবেগীক ও মনোস্তরে প্রবেশ করে।

8.      চিকিৎসায় আরোগ্য পরিলক্ষতি হতে শুরু করলেও রোগীর দায়িত্ব আছে। এক্ষেত্রেও বেদনানাশক, ট্রা্ঙ্কুইলাইজার, এ্যান্টিবায়োটিক, গর্ভনিরোধক পিল, কর্টিজন ইত্যাদি ক্রমাগত সেবনে হোমিও ওষুধের কার্যকারিতায় বাঁধার সৃষ্টি হয়। দাঁতের চিকিৎসা যেমন স্কেলিং ও ক্ষতিকর। কফি সেবনও ক্ষতিকর। তাই এগুলি পরিতাজ্য।

9.      যারা নিয়মিত হোমিও ওষুধ খান তারা ওষুধটি কিভাবে তা হ্যান্ডেল করেন বা সংরক্ষণ করেন তাও দেখার বিষয়। ওষুধটি সরাসরি সূর্যরশ্মি, তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, ক্যাম্ফর, সু্গন্ধি, অতিরিক্ত গরম ও ঠান্ডায় নষ্ট হতে পারে।

10.   সর্বশেষে আরোগ্যক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় রোগীর জীবনীশক্তি শক্তিশালী হয় বিধায় রোগলক্ষণাবলী কিছুটা অবনতি হতে পারে যা কয়েক ঘন্টা হতে এটি কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। রোগী যদি আগে থেকেই এটি না জানেন তবে সাময়িক কষ্ট সহ্য না করতে পেরে তিনি এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন যা পুরো আরোগ্য প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই কনফিউশনটি আবার দেখা যায় যখন রোগী কখনও রোগলক্ষণাবলী পুনঃআগমন বা প্রত্যাবর্তন (relapse) প্রত্যাশা না করেন। কারণ এসব বিষয় বিবেচনা করেই পূর্ণ আরোগ্যের জন্য হোমিওপ্যাথ রোগীকে বিচক্ষণতার সাথে বিশ্লেষণ করেই পরবর্তী ওষুধ দেন। রোগীকে তার ভিতরকার সত্যিকারের পরিবর্তনটির কথা হোমিওপ্যাথকে খুলে বলতে হবে, কমও না বেশীও না। আস্থা রাখতে হবে হোমিওপ্যাথের দক্ষতার উপর। মনে রাখতে হবে পূর্ণ আরোগ্যের জন্য রোগীকে নিরাশ হলে চলবে না।

11.   পরিশেষে, হোমিওপ্যাথি রোগী ও ডাক্তার উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জিং অথচ ফলপ্রসু। এটা এ্যালোপ্যাথিকের মত নয় যে ফলাফল বিবেচনা না করে ডাক্তার রিপোর্ট দেখে ৫-৭-১০টি ওষুধ লিখে দিলো । হোমিওপ্যাথিতে রোগীর দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা, ডাক্তারের প্রতি সহানুভূতির মনোভাব থাকা, সঠিক ওষুধ নির্বাচনে তাঁকে সহায়তা করা, আরোগ্য বাঁধার সৃষ্টি করে এমন বিষয়গুলিকে এড়িয়ে চলা এবং আরোগ্যের প্রক্রিয়ায় যাই ঘটুক বিজ্ঞের মত ধৈর্যধারণ করা। অধিকাংশ রোগীর জন্য এ দায়িত্ব পালন করা সহজ এবং এভাবেই সন্তোষজনক আরোগ্য সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *