আরোগ্য করতে রোগীকে বুঝতে হবে, তার প্রতিকৃতি অংকন করতে হবে।

হোমিওপ্যাথি আজ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম চিকিৎসা পদ্ধতি। দীর্ঘ দিন ধরে ভোগা ক্রণিক রোগী নিরাময়ে ও তাদের সংখ্যা কমাতে হোমিওপ্যাথিকে একটি আদর্শ চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আরোগ্য করতে হোমিওপ্যাথের জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরী তা হলো একটি স্বাস্থ্যকর ও বিশ্বস্ত ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক তৈরা করা। গভীর মনোযোগ সহকারে রোগীর কথা শোনার কোনই বিকল্প নেই।

হোমিওপ্যাথ হিসেবে আমরা জানি রোগীর কথাবার্তা গভীরভাবে শোনার গুরুত্ব কতটুকু। কারণ কেবলমাত্র এর মাধ্যমেই আমরা রুগ্ন ব্যক্তিকে বুঝতে পারি। রোগীর কথা বোঝাটাই তা গ্রহণ করার প্রথম পদক্ষেপ, আর তা পারলেই আমরা রোগীকে আরোগ্য করতে পারবো। আমাদের লক্ষ্য হলো রোগীকে দ্রুত, নির্মল ও স্থায়ী আরোগ্যদান করা। এটি রুগ্ন ব্যক্তির কষ্ট ও যন্ত্রণার প্রতি তার প্রতিক্রিয়া কি তা জানার মাধ্যমেই সম্ভব। আর এই প্রতিক্রিয়া গুলি জানা যায় ধৈর্য, গভীর মনোযোগ ও সমবেদনা সহকারে রুগ্ন ব্যক্তির কথা শ্রবণ করে। ক্রণিক রোগীর রুগ্নতার এই স্কেচটি অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথের সাথে তার প্রথম ও দীর্ঘ সাক্ষাতেই অংকিত হয়ে যায়। আর এই স্কেচটি সঠিকভাবে অংকিত করতে পারার অর্থই ৫০% কাজ শেষ। বাকী থাকে এগুলি বিশ্লেষণ করে সদৃশ উপায়ে সঠিক ওষুধ প্রদান ও সঠিকভাবে কেসটি ফলোআপ করা। প্রযুক্তি আজ একাজে বড়ই সহায়ক ভূমিকা রাখছে। কিন্তু রোগীর প্রতিকৃতি অংকন করতে তার কথা ধৈর্য সহকারে ও মনোযোগ দিয়ে শোনা অত্যাবশ্যক।

হোমিওপ্যাথির কেস টেকিং পদ্ধতির সাথে অন্য সকল চিকিৎসা পদ্ধতির বিস্তর পার্থক্য। কারণ, প্রতিটি রোগীর স্বাতন্ত্র্যসূচক লক্ষণ জানতে হয়। এটি রোগী চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রুগ্ন ব্যক্তির ভিতরের রুগ্নতার নির্যাস বের করে আনতে হোমিওপ্যাথকে অত্যন্ত দক্ষ হতে হয়। শুধুমাত্র এই পদ্ধতি অবলম্বন করলেই তিনি রোগীকে তার পূর্বের স্বাস্থ্যে ফিরিয়ে নিতে পারেন এবং রোগীকে যাবতীয় কষ্টকর রোগলক্ষণ ও রোগ হতে মুক্ত করতে পারেন।

দীর্ঘক্ষণ ধরে কেস টেকিং রোগীর জন্য অনেক সময় বিরক্তিকর হতে পারে। ধারাবাহিক ভাবে তার সকল রোগ, চিকিৎসার ইতিহাস ও অনুভূতি বর্ণনা করা সত্যিই কষ্টকর। তবে এখানেও হোমিওপ্যাথ তার সাহায্যের হাতটি প্রসারিত করতে পারেন। তিনি রোগীর নিকট এভাবে কেস টেকিং-এর গুরুত্ব তুলে ধরতে পারেন। এতে হোমিওপ্যাথের প্রতিও রোগীর আস্থা বৃদ্ধি পায়। রোগীর নিজের এই ব্যাখ্যা তাকে আশ্বস্থ করে যে তাকে ও তার রোগকে বুঝতে হোমিওপ্যাথের নিকট সব খুলে বলা দরকার।  এই প্রক্রিয়ায় কেবল একটি প্রয়োজনীয় সুস্থ-সাবলীল ডাক্তার-রোগী সম্পর্কেরই বিকাশ হয়না; এতে ঐ রোগীর মধ্যে একটি পৃথক নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরী হয়। এটি আমাদের সেরা আরোগ্যের জন্য সহায়তা করতে পারে এবং এর উপর ভিত্তি করেই আমাদের চিকিৎসায় অধিক সাফল্য আসতে পারে।

একটি কেস

আমি এমন একটি রোগীর কেস আজ উপস্থাপন করছি যিনি ১ বছর ধরে গ্যাস্ট্রিকে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। রোগী অত্যন্ত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। সর্বদা দাপ্তরিক ও সভা-সমিতির কাজে ব্যস্ত থাকেন, দীর্ঘক্ষণ ধরে কাজ করেন। তার খাওয়া-দাওয়া ও ঘুম অনিয়মিত। তিনি অধিক মাত্রায় কার্বোহাইড্রেট ও চর্বি জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করেন। তার নিয়মিত কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়না। যথেষ্ট পরিমাণে মলত্যাগ করেন না এবং অতিমাত্রায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। মানসিক অবস্থায় আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় তিনি উত্তম নৈতিকতার অধিকারী এবং স্পষ্টভাষী যদিও কিছুটা উদ্ধত প্রকৃতির। সর্বোপরি তিনি একজন সম্মানিত ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর কর্তৃত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারতো না যদিও তিনি ধৈর্য সহকারে অন্যের কথা শুনতেন ও তাদের সমস্যা বোঝার চেষ্টা করতেন। প্রাথমিক সাক্ষাতে তিনি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন বিধায় সবকিছু খুলে বলতে পারেননি এবং ভাসাভাসা ভাবে তার চরিত্রের নানা দিক বর্ণনা করেন। তার কিছু পারিবারিক সমস্যা ছিল যা তিনি আলোচনা করতে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন। কেবল বলেছিলেন তিনি তার পুত্রের আচরণে খুশী নন।

এই বিষয়গুলির উপর ভিত্তি কের প্রেসক্রাইব করাতে তার লক্ষণাবলীর কিছুটা উন্নতি হয় এবং তার কেসটির ফলাফল ইতিবাচক হবে বলে মনে হয়। কিন্তু তারপরও সমস্যাগুলি মাঝে মাঝে দেখা দিত যাতে তার দৈনন্দিন টুকিটাকি কাজে অসুবিধা হতো। সময়ে সময়ে লক্ষণসাদৃশ্য অনুযায়ী তাকে ওষুধ দেয়া হয়েছে।

ছয় মাস চিকিৎসা শেষে তিনি হোমিওপ্যাথি ত্যাগ করে অন্য চিকিৎসা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ গ্রহণ করে কিছুটা ভাল বোধ করেন। কিন্তু ওষুধগুলি ছেড়ে দিলেই তার সমস্যা আগের মতই দেখা দিত।

এ্যালোপ্যাথিতে তার কষ্টের কোন সমাধান না হওয়ায় তিনি আবারও আমাদের শরণাপন্ন হন। এইবার আমরা তাকে গভীরভাবে কেস টেকিং- এর গুরুত্ব বুঝাতে সক্ষম হই। তিনিও আমাদের নিকট বিস্তারিত খুলে বলতে রাজী হন। এ পর্যায়ে তিনি দু’টি ঘটনার কথা বর্ণনা করেন যেখানে তিনি মারাত্মকভাবে অপদস্থ ও অপমানিত হয়েছিলেন। পরে এ ধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলায় তার মধ্যে সর্বদা উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কাজ করতো এবং এভাবেই একসময় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দিত। এই লক্ষণাবলী সাদৃশ্যে তাকে নতুন করে ওষুধ দেয়া হয়। এরপর তার শুধু শারীরিক অবস্থাই নয়, মানসিক অবস্থারও ব্যাপক উন্নতি হয়।

লক্ষণসাদৃশ্যে তাকে স্ট্যাফিসেগ্রিয়া দেয়া হয়। রোগীর বিশ্বাস অর্জন করা এবং তার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এমনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যে, ঐ ওষুধেই তিনি অতি দ্রুত, নির্মল ও স্থায়ীভাবে আরোগ্য লাভ করেন।

হোমিওপ্যাথির জনক হ্যানিম্যান বলেছেন, ”রুগ্ন ব্যক্তিকে বুঝুন, মানুষটির রোগকে নয়”। তিনি রুগ্ন মানুষটির ভেতরকার গোপনীয় বিষয়াবলী, তার মনোভাব-অনুভূতি, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, তার ভয় ইত্যাদিকে বোঝার উপর জোর দিয়েছেন যাতে করে আমরা কেবল তার শারীরিক লক্ষণাবলীই নয় বরং তার মানসিক অবস্থারও উন্নতি ঘটাতে পারি। কারণ, মানুষের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যাবলী তার জীবনের গুণগত মানের উপরও প্রভাব ফেলে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *