লিউকোরিয়া বা শ্বেতপ্রদর স্ত্রী প্রজনন তন্ত্রের একটি অস্বাভাবিক অবস্থা যেখানে যৌনাংগ হতে সাদা ও অন্যান্য রংয়ের ঘন, আঠালো বা অন্য অনেক প্রকৃতির স্রাব নির্গত হয়। সাধারণত এই স্রাব নারী দেহের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থারই অংশ যা যোনি টিস্যুর নমনীয়তা ও মসৃণতা রক্ষা করে। কখনও বা এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। অধিকাংশ নারী জীবনের কোন না কোন সময়ে কোন না কোনভাবে এ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত, অধিকাংশ নারী এই সমস্যার সম্মুখীন হলে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। অনেকের স্রাবে খুব বেশী দুর্গন্ধ ও ক্ষতকারীতা সহ জ্বালাকর অনুভূতি থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সাথে লিউকোরিয়ার সমস্যা দেখা দেওয়ায় নারী সন্তান জন্মদানেও অক্ষম হয়ে পড়তে পারেন। হোমিওপ্যাথি সফলভাবে এই শ্বেতপ্রদরের চিকিৎসা করতে পারে।

রোগের লক্ষণাবলী স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করলে অবশ্যই এর জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। অস্বাভাবিক শ্বেতপ্রদরের লক্ষণাবলী নিম্নরূপ:

  1. যৌনাংগ হতে ঘন, হলুদাভ, সাদা বা অন্য কোন রংয়ের স্রাব নির্গত হয়,
  2. শরীরের অত্যাবশ্যকীয় তরল পদার্থ নির্গত হওয়ার কারণে নারীরা সাধারণ দুর্বলতা বোধ করেন,
  3. কোমরের নিচের অংশে ও উরুপ্রদেশে ব্যথার অনুভূতি,
  4. যৌনক্রিয়ায় ব্যথা অনুভূত হয়,
  5. যোনির শোথ বা ফুলে যাওয়া সহ তীব্র চুলকানি,
  6. যৌন নালীর মধ্যে জ্বালাকর বেদনা,
  7. যৌনাংগের উপর কালশিটে দাগ ও লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়,
  8. জ্বালাকর মূত্রত্যাগ, ঘন ঘন মূত্রত্যাগের ইচ্ছা হয় অথচ সামান্যই মূত্র নির্গত হয়,
  9. স্রাবের প্রতি মনোসংযোগের কারণে বিরক্তির সৃষ্টি হয় ও কাজে অমনোযোগীতা দেখা দেয়,
  10. তলপেটে টেনে ধরার মত অনুভূতি,
  11. হজম প্রক্রিয়ায় গোলযোগের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ও বমি বমি ভাব দেখা দেয়,
  12. ঘন ঘন মাথা ব্যথা দেখা দেয়,
  13. খিটখিটে মেজাজ এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগভোগ করলে চোখের নিচে ঘন কালো দাগ দেখা দেয়,
  14. হাত-পায়ে জ্বালাকর অনুভূতি ইত্যাদি।

নিমোক্ত বিষয়গুলি শ্বেতপ্রদরের সাধারণ কারণঃ

  1. ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অন্যান্য প্যারাসাইটজনিত ইনফেকশন,
  2. ঘন ঘন ইউরিনারি ট্রাক ইনফেকশন,
  3. যোনি, জরায়ু বা জরায়ুমুখে আঘাত যা গর্ভাবস্থায় একটি সাধারণ ঘটনা,
  4. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাব,
  5. জরায়ু অভ্যন্তরে গর্ভনিরোধক ডিভাইস ব্যবহার,
  6. নানা ধরণের স্প্রে, লুব্রিকেন্ট বা জেলি ব্যবহার,
  7. জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের কারণে ইনফেকশন,
  8. যৌন সংক্রামক রোগ,
  9. অপুষ্টিকর ও অনিয়মিত পানাহার।

লিউকোরিয়া সাধারণত ২ ধরনের যথা:  

শারীরবৃত্তীয় লিউকোরিয়া (Physiological Leucorrhoea): এটি এক ধরণের সাধারণ লিউকোরিয়া যার কারণ কোন প্রকার উত্তেজনা এবং নার্ভাসনেস। এই ধরণের স্রাব নিয়ে চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি অনেক নবজাতকের ক্ষেত্রে সাধারণত ১ সপ্তাহ যাবত দেখা যায় যার কারণ মায়ের ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিবর্তন। তাছাড়া হরমোনের পরিবর্তনজনিত কারণে মেয়েদের বয়:সন্ধিকালেও দেখা দেয়। ডিম্বস্ফোটনের সময়ে, গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে এবং যৌন উত্তেজনার কারণেও অনেকের এ ধরণের লিউকোরিয়া দেখা যায়।  

প্র্যাথলজিক্যাল লিউকোরিয়া (Pathological Leucorrhoea): এর প্রধান কারণগুলো হচ্ছে সাধারণ অসুস্থতা, অপুষ্টিকর খাবার গ্রহণ বা পুষ্টিহীনতার অভাব, যৌন নালীর অকার্যকর অবস্থা এবং অস্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রণালী ও কিছু মানসিক কারণ।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা: হোমিওপ্যাথি একটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিজ্ঞান যেখানে চিকিৎসায় রোগীর স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণের সন্ধান করে তা বিশ্লেষণ করেই ওষুধ নির্বাচন করা হয়। লিউকোরিয়ার চিকিৎসায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে রোগীর বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণাবলী, স্থানীয়করণ, লক্ষণাবলীর সম্প্রসারণ, তীব্রতা এবং হ্রাস-বৃদ্ধি ইত্যাদির উপর ভিত্তি করেই ওষুধ নির্বাচন করা হয়। লিউকোরিয়ার আনুষংগিক উপসর্গ যেমন কোমরব্যথা, যৌনাংগে তীব্র চুলকানি ও জ্বালাকর অনুভূতি ইত্যাদিও ওষুধ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ। লিউকোরিয়ার সফল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জন্য নিম্নোক্ত হ্রাস-বৃদ্ধিকে বিবেচনায় আনতেই হবে।

সময়: কখন লিউকোরিয়ার বৃদ্ধি দেখা দেয় সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন- কেবল দিনের বেলা বা কেবল রাতে, ভোরবেলা, বিকেলবেলা, সন্ধ্যাবেলা, পূর্ণিমার সময় বা সুনির্দিষ্ট কোন সময়।

কখনও কখনও রোগীর মনে হয় উষ্ণ বা গরম পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।

স্রাবের বৈশিষ্ট্য: স্রাবটি ঝাঁজালো এবং জ্বালাকর হতে পারে যার কারণে যোনি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় তা ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পরিহিত কাপড়ে স্রাব লেগে যাওয়ায় তাতে গর্তের বা ছিদ্রের সৃষ্টি করতে পারে। স্রাবটি নানা রংয়ের হতে পারে যেমন- সাদা, হলুদ, বাদামি, কালো বা সবুজাভ যার কারণে পরিহিত কাপড়ে নানা বর্ণের  দাগের সৃষ্টি হয়। অনেকের কাপড় ধৌত করলেও দাগটি সহজে উঠেনা। এটি এ্যালুমিনাসও হতে পারে। এটি জ্বালাকর হতে পারে বা নাও পারে, মাসিক ঋতুস্রাবের পরে রক্তাক্ত স্রাবও হতে পারে। কখনও বা নীলাভ, ধূসর, গাঢ়, মাংস ধোয়া পানির ন্যায়, জেলির ন্যায়, পিন্ডময়, ভাতের মাড়ের ন্যায়, সাদা ঘন পেস্টের ন্যায় দেখা দেয়। স্রাবটি হাটার সময় বৃদ্ধি পেতে পারে। কখনও বা স্রাবটি হতে পারে পাতলা, গন্ধহীন ও স্বচ্ছ। কখনও কখনও বিশেষ করে বিকেল বেলায় ক্রিমের মত স্রাব হতে পারে। কখনও এটি হতে পারে পূঁজভর্তি, আঠালো যা টানলে সূতার ন্যায় লম্বা দেখায় কিংবা অনমনীয়। কখনও এটি মাসিকের ন্যায় অধিক পরিমাণে নির্গত হয় যা মলদ্বার ও আশপাশের এলাকায় গড়িয়ে পড়ে।

অনেক সময় মানসিক-আবেগিক লক্ষণের সাথে বা কাশির সাথে পর্যায়ক্রমে স্রাব দেখা দেয়। গর্ভাবস্থায়ও স্রাব দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় জরুরী চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। গণোরিয়া ও সাইকোটিক কারণেও লিউকোরিয়া দেখা দিতে পারে।

ছোট বালিকাদের লিউকোরিয়া: ছোট বালিকাদের নিয়মিত মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার কয়েক বছর আগে ও পরে লিউকোরিয়া দেখা দিতে পারে। এর মূল কারণ হতে পারে যোনির উত্তেজনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস, ময়লা কাপড় পরিধান, অন্ত্রের কৃমি, অতিরিক্ত মানসিক উদ্দীপনা বা হস্তমৈথুন। বয়:সন্ধিকালে পৌঁছালে কিছু অতিরিক্ত স্রাব হওয়াটাও স্বাভাবিক। এর কারণ যৌন গ্লান্ডের ও যৌনাংগের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাওয়া।

লিউকোরিয়ার গন্ধ: স্রাবটি এ্যামোনিয়ার মত তীব্র, পুরাতন পনিরের মত, মাছের আশটের মত, সবুজ ভুট্টার মত, তীব্র কটু পঁচা, টক বা মিষ্টি জাতীয় গন্ধ হতে পারে। মাসিকের পরে ঋতুস্রাবের মত গন্ধযুক্তও হতে পারে।

স্রাবটি নানা অবস্থায় বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে যেমন- শরীরচর্চা করলে, দাড়ালে, শয়ন করলে, বসলে, হাটলে। হস্তমৈথুনের পর, পায়খানা ও প্রস্রাবের পর।  যৌন উত্তেজনা বা সহবাসের পরেও লিউকোরিয়া দেখা দিতে পারে। অনেকের মেনোপোজ বা রজোনিবৃত্তিকালীনও স্রাব দেখা দেয়।

মাসিক বা রজ:স্রাবের সাথে সম্পর্ক: আমরা অনিয়মিত রজ:স্রাব বা ঋতুস্রাবের বিশৃংখলার সাথে শ্বেতপ্রদরের গভীর সম্পর্ক দেখতে পাই। সেক্ষেত্রে সাদাস্রাবটি ঋতুস্রাবের আগে, মধ্যে বা পরে দেখা দিতে পারে। কখনও বা ঋতুস্রাব শেষ হবার ২ সপ্তাহ পরে বা ২টি ঋতুস্রাবের মধ্যেও এটি দেখা দিতে পারে। মাসিক ঋতুস্রাবের পরিবর্তেও অনেক সময় শ্বেতপ্রদর দেখা দেয়। মাসিক চলাকালীন বা অতি অল্প ঋতুস্রাবের সাথে, মাসিকের মত, মাসিকের ন্যায় গন্ধবিশিষ্ট, বিশেষত দুধের মত স্রাবও দেখা দেয়।

লক্ষণভেদে ক্যাল্কেরিয়া কার্বনিকা, পালসেটিলা, সিপিয়া, ক্রিয়োজোটাম, বোরাক্স, এ্যালুমিনা, মার্কুরিয়াস, বেলেডোনা, আর্সেনিকাম প্রায়শ:ই ব্যবহার করা হয়। তবে লক্ষণসাদৃশ্যে অন্য কোন ওষুধও প্রযোজ্য হতে পারে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিশেষ কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে শ্বেতপ্রদর প্রতিরোধ করা যায়। বিষয়গুলো হচ্ছে:

  1. সঠিক মেয়েলি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা,
  2. তুলা বা কটনের তৈরী আন্ডারওয়্যার ব্যবহার করা উত্তম যাতে সহজে বায়ু চলাচল করতে পারে।
  3. স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ,
  4. পর্যাপ্ত পানি পান করা,
  5. অবশ্যই অতিরিক্ত মশলাজাতীয় খাবার ত্যাগ করা উচিত,
  6. নিয়মিত ও পরিমিত ব্যায়াম, বিশ্রাম গ্রহণ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *