বন্ধ্যাত্ব (infertility) প্রজনন সিস্টেমের এমন একটি রোগ যা নারী-পুরুষের প্রজননতন্ত্রের মৌলিক কার্যাবলীর ক্ষমতাকে দুর্বল বা নষ্ট করে ফেলে। বন্ধ্যাত্ব অনেক কারণে হতে পারে যার মধ্যে জৈবিক (biological) ও মনস্তাত্বিক (psychological) কারণ উল্লেখ যোগ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সফলতা পাওয়া যায়। রোগী যে কারণেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করুক না কেন- হতে পারে একটি সুস্থ প্রজনন সিস্টেম পুনর্বহালের জন্য বা সুনির্দিষ্ট অসুস্থতা আরোগ্যের জন্য যা বন্ধ্যাত্বের সৃষ্টি করেছে অথবা মানসিক কোন সমস্যা সমাধান করার জন্য – সকল ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সাথে স্বাস্থ্যকর খাদ্য-পানীয় গ্রহণ এবং সঠিক জীবনধারা (lifestyle) অনুসরণ করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দেয়া বন্ধ্যাত্বের সংগা হলো- “বন্ধ্যাত্ব প্রজনন সিস্টেমের এমন একটি রোগ যা নিয়মিত অরক্ষিত যৌন মিলনের পরও রোগী ১২ মাস বা ততোধিককালের পরও একটি ক্লিনিক্যাল গর্ভাবস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এখানে শিশুকে স্তন পান করানো বা প্রসব পরবর্তী মাসিক স্রাব বন্ধ থাকা (postpartum amenorrhea) কোন কারণ হিসেবে বিবেচিত নয়।

প্রাথমিক বনাব মাধ্যমিক বন্ধ্যাত্ব:  

প্রাথমিক বন্ধ্যাত্ব (primary infertility): এর অর্থ দম্পতি ১ বছর অরক্ষিত সহবাসের পরও কখনও সন্তান ধারণে সক্ষম না হওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরোও বলেছে, ’যে সকল নারীদের স্বত:স্ফূর্ত গর্ভপাত (spontaneous miscarriage) হয়ে যায় বা যাদের মৃত সন্তান প্রসব হয় বা যারা কখনও জীবন্ত সন্তান জন্ম দেননি তাদের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক বন্ধ্যাত্ব কথাটি প্রযোজ্য’।

মাধ্যমিক বন্ধ্যাত্ব (secondary infertility): এর অর্থ নারী অন্তত একবার গর্ভধারণ করেছিল কিন্তু এর পর আর কখনও গর্ভবতী হয়নি। এর অর্থ নারী সন্তান প্রত্যাশা করেন অথচ পূর্ববর্তী জীবন্ত সন্তান জন্মদানের কমপক্ষে ৫ বছরের মধ্যে অরক্ষিত সহবাস বা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ না করে একবারও জীবন্ত সন্তান জন্মদানে ব্যর্থ হয়েছেন।

বন্ধ্যাত্বের মনস্তাত্বিক প্রভাব: বন্ধ্যাত্বের গভীর মানসিক প্রভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দম্পতি সন্তান ধারণের কল্পনা করামাত্রই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে যৌনস্পৃহা ও যৌনক্ষমতা উভয়ই হ্রাস পেতে পারে। অনেক বন্ধ্যা দম্পতির মধ্যে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে। সন্তান প্রত্যাশী অথচ বন্ধ্যা নারীদের বিষণ্ণতার মাত্রা হৃদরোগ বা ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের সমান।

বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে নারী না পুরষ দায়ী? সন্তান না হওয়ার জন্য ২০-৩০% পুরুষের বন্ধ্যাত্ব­­ এবং ২০-৩৫% নারীর বন্ধ্যাত্ব দায়ী। ২৫-৪০% ক্ষেত্রে ­স্বামী-স্ত্রী উভয়ই কোন না কোনভাবে দায়ী। ১০-২০% ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

বন্ধ্যাত্বের সাধারণ কারণসমূহ:

  1. যৌন সংক্রামক রোগ (STD) যেমন, গণোরিয়া, সিফিলিস ইত্যাদি,
  2. বংশগত বা জিনগত প্রবণতা,
  3. ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ,
  4. মারাত্মক অসুস্থতা যেমন- ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের রোগ, অচিকিৎসিত বা অণির্ণিত সিলিয়াক রোগ, অ্যাড্রিনাল রোগ, হাইপোপিটুইটারিজম ইত্যাদি।
  5. নানা জাতীয় বিষের ক্ষতিকর প্রভাব, যেমন- রাসায়নিক ধূলিকণা, কীটনাশক, উদ্বায়ী জৈব দ্রাবক (volatile organic solvents) বা সিলিকোনস্, বিষাক্ত আঠা ইত্যাদি।
  6. অধুমপায়ীদের চেয়ে ধুমপায়ীদের বন্ধ্যাত্বের সম্ভাবণা ৬০% অধিক।

নারীদের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের কারণ: নারীকে গর্ভবতী হতে হলে কিছু নির্দিষ্ট বিষয় ঘটতেই হবে যেমন- ডিম্বাশয় হতে ডিম্বাণু উন্মুক্ত হওয়ার সময় অর্থাৎ ডিম্বস্ফোটনকালীন সহবাস করতে হবে। যে সিস্টেমটি ডিম্বাণু উৎপন্ন করে তা সর্বোত্তম পর্যায়ে কাজ করতে হবে অর্থাৎ তার পূর্ণ সুস্থতা দরকার। তার হরমোন সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। নারীদের ক্ষেত্রে মুল সমস্যা গর্ভাধান জনিত যার মূলকারণ হয় ফ্যালোপিয়ান টিউবের কাঠামোগত সমস্যা অথবা জরায়ুর সমস্যা বা ডিম্বাণু উন্মুক্ত হওয়ার সমস্যা। ফ্যালোপিয়ান টিউব বা গর্ভনালীতে সৃষ্ট ব্লকেজও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার কারণ ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যু, ইনফেকশন, বিকলাংগতা, ইনফেকশন যেমন ক্লাইমাইডিয়া (Chlamydia) ইত্যাদি। নারীদের বন্ধ্যাত্বের আরেকটি প্রধান কারণ ডিম্বাণু তৈরীতে অক্ষমতা। ডিম্বাণুর বিকালংগতাই অনেক ক্ষেত্রে গর্ভধারণকে জটিল করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (PCOS) – যখন ডিম্বাণু   ডিম্বাশয়ে শুধুমাত্র আংশিকভাবে তৈরী হয় এবং সেখানে পুরুষ হরমোনের মাত্রা অধিক হয়। কিছু নারী এজন্যই বন্ধ্যা হয় যে তাদের ডিম্বাশয় পরিপক্ক না হওয়ায় ডিম্বাণুই তৈরি হয়না। নারীদের খবু কম বা খুব বেশী ওজনও সন্তান ধারণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

নারীদের বন্ধ্যাত্বের কিছু সাধারণ কারণ হলো-

  1. ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা PCOS,
  2. প্রধানত যে কারণে নারীরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তা হলো- ডিম্বস্ফোটনের সমস্যাজনিত বন্ধ্যাত্ব বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের প্রতিবন্ধকতা বা ব্লকেজ,
  3. শ্রোণী প্রদাহজনিত রোগ (pelvic inflammatory disease) যার কারণ কোন ইনফেকশন যেমন যক্ষ্ণা,
  4. জরায়ুর সমস্যা,
  5. পূর্ববর্তী টিউবাল লাইগেশন,
  6. এন্ড্রোমেট্রিওসিস,
  7. নারীর অধিক বয়স।

পুরুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের কারণ: পুরুষ বন্ধ্যাত্বের প্রধান কারণ কম গুণগত মান সম্পন্ন বীর্য এবং অল্প পরিমাণ বীর্য যার কারণ- অন্ত:স্রাবী (endocrine) গ্লান্ডের সমস্যা, মাদকদ্রব্য সেবন, বিকিরণ বা radiation এবং নানা ধরণের ইনফেকশন। এছাড়া অন্ডকোষের কাঠামোগত সমস্যা (testicular malformations), হরমোনের ভারসাম্যহীনতা (hormone imbalance), নালী সিস্টেমের কোথাও প্রতিবন্ধকতা বা ব্লকেজ (blockage of the man’s duct system)।

ডায়াগনসিস: চিকিৎসক বন্ধ্যা দম্পতির (স্বামী-স্ত্রী উভয়ের) মেডিকেল হিস্টি নেন, প্রয়োজনে শারীরিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এরপর তিনি স্বামী-স্ত্রী উভয়কে কিছু সাধারণ পরীক্ষার উপদেশ দেন। এভাবে দম্পতির সন্তান না হওয়ার কোন জ্ঞাত কারণ থাকলে তা শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা: এ চিকিৎসায় সাধারণত নিম্নোক্তভাবে করা হয়-

  1. প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওষুধ (fertility medication), মেডিকেল ডিভাইস, সার্জারি কিংবা এগুলোর সমন্বয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়,
  2. শুক্রাণু যদি ভাল মানের হয় এবং নারীর প্রজননতন্ত্রের কাঠামোগত অবস্থা ভাল হয় (ফ্যালোপিয়ান টিউবের ব্লকেজ, কোন ক্ষত, দাগ বা scarring ইত্যাদি না থাকে) তবে নারীকে ডিম্বাশয়ের উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী ওষুধ দেয়া হয়,
  3. রোগীকে বাড়ীতে গর্ভধারণ ক্যাপ, সার্ভিক্যাল ক্যাপ ব্যবহার করতে দেয়া হয়। এর মধ্যে শুক্রাণু রেখে গর্ভধারণ ডিভাইসের সাহায্যে জরায়ুমুখে স্থাপন করা হয়। অথবা ইন্ট্রাইউটেরিয়ান ইনসেমিনেশন (IUI) এর ব্যবস্থা করা হয় যেক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটনের সময় ক্যাথেটারের মাধ্যমে শুক্রাণু জরায়ুতে প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়,
  4. এভাবে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির দ্বারা যদি পূর্ণ মেয়াদে গর্ভাবস্থা অর্জন ব্যর্থ হয় তাহলে চিকিৎসক রোগীকে টেস্ট টিউব বেবীর জন্য সুপারিশ করেন যাকে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা IVF বলে।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:

নারী-পুরুষ উভয়ের বন্ধ্যাত্ব আরোগ্যে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকর। উভয়ের ক্ষেত্রে এ চিকিৎসাপদ্ধতি নিম্নোক্তভাবে কাজ করে-

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দেবার পূর্বে একটি চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরী করা হয়। এক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর যাবতীয় শারীরিক, আবেগিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক বিশংখলাকে সুচাররূপে সংগ্রহ করে রোগীর একটি প্রতিকৃতি তৈরী করা হয়। এরপর মানসিক অবরুদ্ধতা, দ্ব্যর্থক ও বিশৃংখল চিন্তা ও ইচ্ছার জগত ইত্যাদি যা বন্ধ্যাত্বকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে হয় তা শনাক্ত করার জন্য রোগীর কেসটি বিশ্লেষন করা হয়। তারপর রোগীর কেসের সাথে নিকটতম সাদৃশ্যযুক্ত ওষুধ নির্বাচন করে রোগীকে সেবন করানো হয়। ওষুধটি দ্বারা সন্তান প্রত্যাশী পুরুষ ও নারীর শারীরিক সমস্যার সমাধান করা ছাড়াও মানসিক চাপ (stress) দুশ্চিন্তা (anxiety) ও বিষণ্ণতাকে (depression) নিরাময় করা হয়। হোমিও চিকিৎসা বন্ধ্যাত্বের এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও দূর করে।

নারীদের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের বিশৃংখল ও অনিয়মিত মাসিক ঋতুচক্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে শরীরের হরমোণ নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্য ফিরে আসে এবং ডিম্বেস্ফোটন প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক হয়।

পুরুষদের জন্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা তাদের শুক্রানুর পরিমাণ, গুণগত মান, শুক্রানুর চলাফেরার গতি ইত্যাদি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। চিকিৎসায় হরমোনের উৎপাদন ও কার্যকারিতা স্বাভাবিক হয় এবং দ্রুত বীর্যপাতের সমস্যা দূর করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.