আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন অসুস্থতা আবার বেচাকেনা হয় নাকি! হ্যাঁ হয়। এখানে ক্রেতা আমরা সাধারণ অসহায় মানুষ। আর বিক্রেতা বিশ্বের বৃহৎ বৃহৎ সকল ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী। তারা আমাদের সকলকে রোগী বানিয়ে দেদারসে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। কিভাবে? সেটা আপনাদের জানাবো বলেই আজকের লেখা।

Ray Moynihan & Alan Cassels এর Selling Sickness নামক গবেষণা গ্রন্থে (১) ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী (ওষুধ কোম্পানি), (২) মেডিকেল ডক্টর (এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক) এবং (৩) মেডিকেল গবেষকদের চাঞ্চল্যকর কার্যকলাপের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। প্রসংগত, ঐ তিনটি পক্ষের গবেষণার ফলাফলের (!) বরাত দিয়ে- আমাদের মোটেই প্রয়োজন নেই এমন সব ওষুধ সেবন করতে বাধ্য করা হচ্ছে যাতে করে তাদের ক্রমাগত ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি তথা মুনাফা বজায় থাকে। এখানে জনকল্যাণ নামক কোন বিষয়ই নেই। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবনের ফলে আমরা দিন দিন হয়ে পড়ছি মারাত্মক অসুস্থ।

প্রতিটি ব্যবসায়ী প্রতি বছর প্রবৃদ্ধি (Growth) চায়। এতে কোন অন্যায় নেই। নিশ্চয়ই ব্যবসা করে প্রতি বছর ক্রমাগত লোকসান করে ব্যবসাকে লাটে উঠানো কোন ব্যবসায়ীরই কাম্যই নয়। কোন দরদী ব্যবসায়ী জনকল্যাণে এমন ব্যবসা করলেও অচিরেই তিনি রাস্তায় বসে যাবেন। এমন জনকল্যাণ তাই স্বজ্ঞানে কোন ব্যবসায়ী করবেন না। এমন ব্যবসায়ী বাস্তবে আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই।

ক্রমাগত প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নেয় নানান কৌশল, নানান পরিকল্পনা। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) বিভাগ এ কাজে সবচেয়ে বেশী বিনিয়োগ করে থাকে। তারা ব্যবসার ভবিষ্যত কি তা জানতে চান। জানতে চান ব্যবসায়ের ক্রমাগত মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রে কোন ঝুঁকি আছে কিনা, বাজার তথা ক্রেতার চাহিদা, গতি-প্রকৃতি-মানসিকতার কি পরিবর্তন হচ্ছে তা জানাও তাদের গবেষণার লক্ষ্য। উদ্দেশ্য কোন ভাবেই যেন কোম্পানী ক্ষতির মুখে পড়ে সর্বহারা না হয় এবং ক্রমাগত মুনাফা নিম্নগামী না হয়। তারা মনোযোগ দেন পন্যের গুণগত মান উন্নয়ন, নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবণে। গ্রুপ অব কোম্পানীর নামে অনেক নতুন ক্ষেত্রে ব্যবসা শুরু করেন অনেকে।

কিন্তু ওষুধ কোম্পানীগুলো ক্রমাগত মুনাফা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপী কি কৌশল নিয়েছে তা শুনলে আপনারা শিউরে উঠবেন। যাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিশ্বব্যাপী মানব স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং রুগ্ন-বিপন্ন মানুষকে সহায়তা দেয়া, তাদের গবেষণা সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে এবং একমাত্র মুনাফা অর্জনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। গত কয়েক দশক ধরে তারা গবেষণা করছে কিভাবে ভোক্তা তথা ক্রেতা তথা রোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে এবং তাদেরকে চিররোগী তৈরী করে বেশী ওষুধ বিক্রয় করে আকাশচুম্বী মুনাফা করা যায় সেটা নিয়ে। এদেরই মাফিয়া বলা হয়। যারা তাদের মুনাফার বাইরে কোনপ্রকার মংগল চিন্তা মাথায় রাখেনা।

কিভাবে?

ওষুধ কোম্পানীগুলো একটি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে গত কয়েক দশক ধরে। গবেষণার উদ্দেশ্য ক্রমাগত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এমন ব্যবসায়িক নীতি গ্রহণ। ওষুধ কোম্পানীর অর্থায়নে ডাক্তার এবং মেডিক্যাল গবেষকদের দিয়ে ওষুধ কোম্পানীগুলো এমন সব উদ্ভট ও বিভ্রান্তিকর গবেষণা করছে যাতে পৃথিবীর সকল মানুষকে কোন না কোনভাবে চিররোগী বানানো যায় এবং জ্যামিতিক হারে ক্রমাগত ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা যায়।

যেমন ধরুন ১২০/৮০ রক্তচাপের স্বাভাবিক মাত্রা থাকলেও ঐ সকল গবেষণায় তারা দাবী করছেন এবং গবেষকদের গবেষণার ভ্রান্ত ফলাফল দিয়ে তারা বলতে চাইছেন যে এখন থেকে কোন ব্যক্তির রক্তচাপ ১১০-১১৫/৭০-৭৫ থাকলে স্বাভাবিক-সুস্থ ঐ মানুষটিকে প্রি-হাইপারটেনশনে (প্রাথমিক উচ্চ রক্তচাপে) আক্রান্ত বলে গণ্য করা হবে এবং ঐ রোগী (?) এখন থেকেই নিয়মিত ওষুধ সেবন না করলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবেন বলে হুমকী দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ঐ রোগী যে কোন সময় হার্ট ফেইল/স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন বলে ভীতি দেখানো হচ্ছে। এই এক ঘোষণাতেই উচ্চ রক্তচাপের রোগী বিশ্বব্যাপী অন্তত: ৫০ কোটি বৃদ্ধি পাবে, যারা স্থায়ী ক্রেতায় পরিণত হচ্ছেন এবং মৃত্যুকে আলিংগন করা পর্যন্ত ওষুধ চালিয়ে যাবেন। সাথে আরো একাধিক স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরী হলে তো কথাই নেই। যুক্ত হবে আরো অনেক ওষুধ। একই ভাবে বিভিন্ন টেস্টের মাধ্যমে তারা রোগীকে ব্লাডসুগার, ক্রিয়েটিনিন ও অন্যান্য টেস্টের মাত্রা স্বাভাবিক রেঞ্জের চেয়ে সামান্য কিছুটা কমিয়ে এনে রোগীকে প্রি-ডায়াবেটিক বলছেন, বলছেন কিডনীর রোগী। অনেক ক্ষেত্রে অন্য কোন জটিল রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবণা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন রোগীর মনে। আর ঐ সকল রোগ ঢেকাতে করণীয় কি? এখনই ওষুধ ধরতে হবে। যে ওষুধ কখনও ছাড়া যাবেনা।

বলাবাহুল্য, যে সকল রোগের কথা তারা বলেন তার একটিও নিরাময়যোগ্য নয়। ফলত: সারা জীবন ওষুধ সেবন করেই রোগকে ম্যানেজ করার পরামর্শ দেন ডাক্তারেরা। কেবল অটোইমিউন রোগ নামে শ্রেণীভুক্ত ১৩৪টি রোগের উপর তারা একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এর মধ্যে ৮২ টি রোগের কখনও স্থায়ী আরোগ্য সম্ভব নয়। একথা জেনেও তারা আমৃত্যু ওষুধ সেবন করার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে- আরোগ্য যদি নাই হয় তাহলে কেন এই ক্ষতিকর চিকিৎসা গ্রহণ? সারাজীবন এভাবে নির্বিচারে ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোগী একটির পর একটি জটিল-ক্রণিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে, ঐ সকল রোগ অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেই ঢেকানো সম্ভব ছিল।

আমাদের একটু ভেবে দেখা উচিত- চিকিৎসা সেবার নামে আমরা কোন আধুনিক চিকিৎসার আশ্রয় নিচ্ছি?

সবশেষে, যে কথাটি না বললেই নয় তাহলো হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অত্যন্ত আধুনিক এবং বিজ্ঞান সম্মত চিকিৎসা। তবে এখানে অবশ্যই রোগীর যাবতীয় শারীরিক-আবেগিক-মানসিক লক্ষণের সমন্বয়ে রোগীকে আরোগ্য করার চেষ্টা করতে হবে। রোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে তা দুর করা অত্যন্ত জরুরী। কারণটি জিইয়ে রেখে রোগ নামক ফলাফলকে (হোক সেটা ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, এ্যাজমা, ক্যান্সার, হেপাটাইটিস ইত্যাদি) কখনও নির্মুল করা সম্ভব নয়। রোগীর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। সর্বোপরি, ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মূল লক্ষ্য। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হলে রোগের নাম যা-ই হোক না কেন প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে রোগীকে স্বাস্থ্যে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।

আধুনিক (?) এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা অধিকাংশ অটো-ইমিউন রোগ অনারোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। তারা মনে করে ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ বলে আর কিছুই করার নেই। এটিই তাদের শেষ কথা। অতএব সারাজীবন ওষুধ খেয়েই অন্তত: বেচে থাকুক রোগী। উল্লেখ্য রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার এই বিধ্বস্ত অবস্থার জন্যও ভুল চিকিৎসা অনেকাংশে দায়ী।
হোমিওপ্যাথির প্রথম কথাই ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) কে শক্তিশালীকরণ। আর এটা করতে পারলেই সকল রোগ আরোগ্য সম্ভব। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার শেষ কথাই হোমিওপ্যাথির প্রথম কথা।

আপনি কি একটি বারও ভেবে দেখবেন না সুচিকিৎসার নামে কি চিকিৎসা গ্রহণ করছেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *