মানুষের রোগাক্রান্ত হওয়ার বৃহৎ ৩টি কারণ- বংশগত রোগ প্রবণতা, বিশৃংখল জীবনযাত্রা এবং রোগ চাপা দেয় এমন চিকিৎসা। জীবনযাত্রা প্রণালীর একটি বড় অংশ জুড়ে আছে খাদ্য-পানীয় গ্রহণ। খাদ্য-পানীয় আমাদের শক্তি যোগায়, ক্ষয় পূরণ করে, রোগ প্রতিরোধ করে। কিন্তু খাদ্য-পানীয় গ্রহণই অনেক সময় রোগের কারণ হয়। কিভাবে তা জানাতেই আজকের লেখা।

আমরা সবাই জানি যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। সকল বিষয়েই আমাদের সামনে দিক নির্দেশনা রয়েছে; সহজ, ক্ষুদ্র বিষয় হতে জীবন পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্ত কোন কিছুই এর বাইরে নেই। ইসলাম সহজ-সরল ও আরামদায়কভাবে পালন করা যায় এমন একটি জীবন ব্যবস্থা। ইসলামে এমন কিছু নেই যা পালন করা কষ্টসাধ্য।

আমাদের খানাপিনার বিষয়েও মহান আল্লাহ সুন্দর নির্দেশনা দিয়েছেন। খাদ্য-পানীয়ের ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশনা তথা মূলনীতিকে দু’টি বাক্যের মাধ্যমেই ব্যাখা করা যায়ঃ

  1. হালাল ও ভাল খাদ্য গ্রহণ করতে হবে কারণ, যাবতীয় হালাল খাদ্যই স্বাস্থ্যকর।
  2. পরিমিত পরিমাণে খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করতে হবে।

ব্যাখ্যায় আসা যাক-

হালাল ও ভাল খাদ্য তা গ্রহণঃ

কোরআন ও সুন্নাহে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ, ভিটামিন ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান সমৃদ্ধ খাবারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর খাবার নিষিদ্ধ করা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ”হে মানব মন্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু-সামগ্রী ভক্ষন কর। আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (২: 168)”। অন্য একটি আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ”অতএব, আল্লাহ তোমাদেরকে যেসব হালাল ও পবিত্র বস্তু দিয়েছেন, তা তোমরা আহার কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর যদি তোমরা তাঁরই এবাদতকারী হয়ে থাক। (১৬: 114)”।

অতএব, আল্লাহ শুধু খাদ্য ভক্ষণ করতে বলেননি বরং খাদ্য অবশ্যই হালাল হতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ’ভাল খাদ্যে’র উপরও জোর দিয়েছেন। যাতে করে আমরা হালাল ও ভাল খাদ্যের গুরুত্ব বুঝতে সমর্থ হই। আর ভাল খাদ্যের প্রকৃত অর্থই হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্য। সুতরাং স্বাস্থ্যকর খাদ্য খাওয়া, হালাল খাদ্য খাওয়ার মতই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং যখনই আপনি হালাল খাবার খুঁজবেন এটাও নিশ্চিত হবেন যে, খাদ্যটি আপনার জন্য ভাল বা স্বাস্থ্যকর কিনা।

নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ্ তাঁর অসীম রহমতের মাধ্যমে আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর সকল খাদ্য হালাল হিসেবে অনুমোদন করেছেন এবং ক্ষতিকর খাবারগুলো নিষিদ্ধ করেছেন।

পরিমিত খাদ্য গ্রহণঃ

পাকস্থলীই অধিকাংশ রোগের উৎপত্তিস্থল এবং সংযম অবলম্বনই এজাতীয় রোগ হতে বাঁচার উপায়। এটা স্পষ্ট যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণই আধুনিক অনেক রোগে আক্রান্ত হবার মূল কারণ। এ কারণে নবী (সাঃ) বলেছেন, ”আদম সন্তান তার পাকস্থলীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোন পাত্র পূর্ণ করেনা। বেঁচে থাকার জন্য আদম সন্তানের কয়েক লোকমা খাদ্যের প্রয়োজন হয়। তাকে যদি এটা পূরণ করতেই হয় তবে এর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য দ্বারা, এক-তৃতীয়াংশ পানি দ্বারা এবং এক তৃতীয়াংশ বায়ু চলাচল অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য” (আত-তিরমিজি)।

এই হাদিসটি বুঝতে হলে আমাদের খাদ্য সংক্রান্ত আরো সকল হাদিসকে বিবেচনা করতে হবে। আলোচনার খুব গভীরে না গিয়ে ইসলাম আমাদের দৈনিক কি খাদ্য ও কি পরিমাণে খাওয়ার অনুমোদন দেয় সেটা সংক্ষেপে দেখা যাকঃ  

ইসলাম আমাদের সর্বোচ্চ পাকস্থলীর দুই-তৃতীয়াংশ খাদ্য-পানীয় গ্রহণের সুপারিশ করে। মাঝে মধ্যে আমাদের ১০০% পাকস্থলী পূর্ণ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর অতিরিক্ত খেলে সেটা পাপে পরিণত হয়। আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন অতিভোজন ইসলামে পাপ হিসেবে বিবেচিত। প্রমাণস্বরূপ ইসলামী স্কলারেরা এই আয়াতকে ব্যবহার করেন, ”হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। আল্লাহ অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না (৭: 31)”।

আপনি দিনে কতবার খাবেন সে ব্যাপারে কোন নিয়ম বেধে দিয়ে ইসলাম আপনাকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয়নি। তথাপিও আপনি যদি সর্বোচ্চ দুই-তৃতীয়াংশ পরিমাণে খাবার-পানীয় গ্রহণ করেন এবং দিনে এভাবে ৩-৪ বার খান তাতে কোন অন্যায় নেই। তবে শর্ত হলো –

  1. আপনি শরীরের যত্ন নেবার জন্যই খাদ্যগ্রহণ করবেন এবং অতিরিক্ত খেয়ে বা অনাহারে থেকে নিজের ক্ষতি ডেকে আনবেন না।
  2. যে পরিমাণ খাদ্য আপনি গ্রহণ করবেন তা আপনার শরীরে শক্তি যোগাবে যার ফলে আপনি খুব ক্লান্ত বা ক্ষুধার্ত না হয়েই দৈনন্দিন কাজ কর্ম ও সৃষ্টিকর্তার ইবাদাত করতে পারবেন।

এটিও বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, অতিভোজন শুধু আপনার শরীরকে ক্ষতিগ্রস্থ করেনা বরং এতে আপনার সামগ্রিক মংগল ও আধ্যাত্মিকতা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অতিভোজনে আপনার তাৎক্ষণিক কিছু সমস্যার সৃষ্টি করে যেমন-

  1. অবসন্ন ও অলস করে তোলে,
  2. অধিক ঘুমের কারণ হয়,
  3. উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে,
  4. সময় অপচয় করে,
  5. আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার আয়ু খাটো করে দেয়,
  6. আল্লাহ থেকে গাফিল রাখে।

আল্লাহ্ আমাদেরকে এ সকল বিপদ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

আপনি যদি নিজেকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারি দেখতে চান এবং এবং কম ঘুমাতে চান তবে কম খাওয়ার অভ্যাস করুন।

নবী (সাঃ) অতিভোজনকে অমুসলিমের বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করেছেন, ”একজন বিশ্বাসী এক অন্ত্র খায় (একটু খাবার খেয়ে সন্তুষ্ট থাকে), এবং একজন কাফির (অবিশ্বাসী) বা মুনাফিক সাত অন্ত্র/পেট খায় (অর্থাৎ অনেক বেশী খায়)” (সহিহ্ বুখারী)।

এই হাদিসটি নিয়ে একটি ভাবুন। এটি প্রকৃতপক্ষে আমাদের জন্য একটি ওয়েক-আপ কল। আর মনে রাখবেন: যখনই আপনি দুই-তৃতীয়াংশ খাচ্ছেন, আপনি মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য পূরণ করছেন। সুবহানাল্লাহ্!

অপব্যয়ের নিন্দাঃ

সবশেষে, খাদ্যে অপব্যয় সম্পর্কে কিছু কথা। আল্লাহ্ হালাল খাবারেও সীমালংঘনকে অনুমোদন দেননি। আল্লাহ বলেন, ”হে বনী-আদম! … খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। আল্লাহ্ অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না। (৭: 31)”। এই আয়াতে অত্যধিক খাওয়া অসংযত হিসেবে স্বীকৃত হয়ে উঠেছে এবং আমাদেরকে অতিভোজন হতে সাবধান করা হয়েছে।

মনে রাখবেন আপনি ভাল খাচ্ছেন মানেই নিশ্চিতভাবে পরিমাণে কম খাচ্ছেন। নবী (সাঃ) এর জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো তিনি সব সময়ই অল্পস্বল্প খাবার খেতেন। তিনি কদাচিৎ সামান্য বেশী খেলেও কখনও অতিভোজন করেননি। অন্যান্য বিষয়ের সাথে নিঃসন্দেহে খাবার গ্রহণেও নবী (সাঃ) এর পথ অনুসরণযোগ্য, কারণ তাঁর জীবনযাত্রা ছিল নিখুঁত এবং নিশ্চিতভাবে পূর্ণাংগ ইসলামী ধারার উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমরা কি পারিনা পরিমিত পরিমাণে হালাল ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে আধুনিক রোগ যেমন, ওবেসিটি, ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অতি কোলেস্টেরল, ক্যান্সার সহ অনারোগ্য (!) অনেক আধুনিক রোগকে প্রতিহত করতে?

আল্লাহ্ আমাদের পরিমিত পরিমাণে হালাল ও ভাল খাদ্য গ্রহণের তৌফিক দিন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *