আমরা যাকে রোগ মনে করি – বিশেষত, শারীরিক স্তরে, সেগুলো আসলে রোগ নয়; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর রুগ্নতার বহি:প্রকাশ তথা রোগের ফল। যেমন ধরুন- ডায়বেটিস, উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপ, হৃদরোগ, নার্ভাস সিস্টেমের রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ যেমন- ঠান্ডা-সর্দি-কাশি বা এ্যাজমা, যক্ষ্মা ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে, রুগ্ন মানুষটির প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি (Immune system) ভিতরে ভিতরে এবং ধীরে ধীরে আক্রান্ত হয়েছে। তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা একসময় হার মেনে নিয়েছে এবং নানা রোগ নানা নামে তার শরীরে স্থান করে নিয়েছে।

গভীর অনুসন্ধান করলে রোগের যে সকল কারণ আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় তার কোনটি বংশগত (Genetic), কোনটি রোগীর বিশৃংখল জীবনযাত্রা প্রণালী (Lifestyle) আবার কোনটি বা  ক্ষতিকর ও রোগলক্ষণ চাঁপাদায়ক এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ সেবনজনিত (Suppression from Drug)।

প্রকৃতপক্ষে, রোগের কারণ রোগীর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। যদি রোগীকে আরোগ্য করার উদ্দেশ্য থাকে, তবে আমাদের অবশ্যই রোগের কারণ উৎঘাটন করতে হবে। রোগের নাম কি তা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের ওষুধ নির্বাচনে ততোটা সহায়ক নয়। আর এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক ল্যাবেটেস্টে নির্ণীত রোগের সারাজীবন চিকিৎসা করবেন; কারণ তার বিবেচনায় এগুলি অনারোগ্য।

ল্যাবটেস্টের মাধ্যমে ডাক্তাররা আসলে রোগীর প্রতিটি রোগের একটি করে নাম দিতে চান। কি কারণে রোগ হল তার অনুসন্ধান করতে চাননা এমনকি তারা এটি করতেও অপারগ। এটা খুবই যুক্তিযুক্ত যে রোগের কারণসমূহ জিঁইয়ে রেখে, রোগের ফলকে দমন করে কখনও রোগ নির্মুল করা সম্ভব নয়; প্রকৃত রোগীকে পূর্ণ নিরাময় তো দুরের কথা। এটা কল্পনা করা সত্যিই হাস্যকর যে রোগীর কেবল ডায়বেটিস বা হৃদরোগ বা এ্যাজমা বা উচ্চ রক্তচাপ নামক কিছু ব্যাধি আছে; অন্য সকল বিবেচনায় সে পূর্ণ সুস্থ। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে রোগী আগে সার্বিকভাবে অসুস্থ হয়েছে; পরে নানা নামে তার রোগগুলি সনাক্ত হয়েছে।

আমাদের কাছে অনেক রোগী আসছেন যারা দিনে গড়ে ১৫টির অধিক এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ সেবন করেন। ল্যাবটেস্টে যতটি রোগের নাম পাওয়া গেছে প্রতিটির জন্য ২/১ টি করে ওষুধ দেয়া হয়েছে। কিছু দেয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া রোধের জন্য। রোগীকে ধারণা দিয়ে দেয়া হচ্ছে তার রোগ কখনও আরোগ্য হবে; এভাবেই সারা জীবন চলবে। অথচ যেসকল রোগী একসময় সামান্য ২/১ টি কষ্টকর উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তিনি আজ মারাত্মক জটিল সকল রোগে আক্রান্ত। দিন যত যাচ্ছে নতুন, নতুন নামে রোগের সংখ্যাও বাড়ছে, বাড়ছে জটিলতাও।

শুরুতেই রোগের কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা দিলে, জীবনযাত্রা তথা খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, পরিমিত ঘুম-বিশ্রাম ইত্যাদি উপদেশ দ্বারা সহজেই এ সকল রোগীকে আরোগ্য করা সম্ভব হতো।

রুগ্ন মানুষটিকে সুস্থ করতে পারলে রোগ – সে যে নামেই থাকুক না কেন আরোগ্য হবে ইনশাল্লাহ্। ল্যাব টেস্টে ডায়গসসিসের নামে যে সকল রোগের নাম পাওয়া যায় (প্রকৃতপক্ষে যা রোগীর সার্বিক রুগ্নাবস্থার ফলাফল, কখন তা রোগের কারণ নয়) এ্যালোপ্যাথদের বিবেচনায় সেসকল রোগ কখনও আরোগ্যযোগ্য নয় (incurable)। কেবল অটোইমিউন রোগ নামক ১৩২টি রোগের মধ্যে এ্যালোপ্যাথদের পরিচালিত গবেষণায় ৮২টি রোগকে স্থায়ীভাবে অনারোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ইমিউনিটির বিশৃংখলাজনিত এ সকল রোগ এ্যালোপ্যাথদের বিবেচনায় কখনও আরোগ্য হবেনা। ইমিউনিটির বিশৃংখলার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডাক্তার প্রকারন্তরে তার অপারগতার কথাই স্বীকার করে নিচ্ছেন।

এ্যালোপ্যাথির শেষ কথা যেখানে ইমিউনিটির বিশৃংখলা; হোমিওপ্যাথির প্রথম কথাই সেখানে ইমিউনিটি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সারিয়ে তোলা। একজন হোমিওপ্যাথের প্রথম কাজই হচ্ছে রোগীর সার্বিক লক্ষণাবলীর ব্যাপক ও গভীর অনুসন্ধান করা এবং বিশৃংখলাটি কোথায় তা সনাক্ত করে বিভিন্ন উপায়ে তা দুর করার চেষ্টা করা। কারণ, প্রতিরোধ ব্যবস্থা কে পূর্বেকার সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারলে রোগের নাম যাই হোকনা কেন তা আরোগ্য হবে ইনশাল্লাহ। প্রতিটি রোগীর কষ্টকর অথচ ছন্দময় অনুভূতির মধ্যেই আসল রোগের সন্ধান পাওয়া যায়।

পুনশ্চ: রোগের কারণ যেখানে বাহ্যিক অর্থাৎ যে কোন প্রকার দুর্ঘটনাজনিত সেখানে বাহ্যিক চিকিৎসাই গ্রহণ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.