হোমিওপ্যাথিতে সফল কেস টেকিং এর অর্থ রোগী চিকিৎসায় ৫০% সফলতা। রোগীর কেস নেয়ার ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথকে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে হয়। ল্যাবটেস্টে মূলত: অব্জেকটিভ লক্ষণপাওয়া যায় যার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ রোগীর মুখে তার কষ্টকর অনুভূতির কথা শোনা, রোগীর আত্মীয়-পরিজনের নিকটে অনেক কিছু জানা যায়, ডাক্তারের পর্যবেক্ষণ তো আছেই। সব মিলিয়েই কেস টেকিং সম্পন্ন হয়। তারপর সেটি স্টাডি করে ওষুধ নির্বাচন। মুলত: কেস টেকিং এর ৫/৬ টি পৃথক অংশ থাকে।  

প্রথমত, রোগীর প্রধান রোগ (Chief complaint or CC): এই অংশে রোগীর রোগাক্রান্ত অংগ, রোগের ধরণ, যে সকল বিষয় রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটায় ইত্যাদি সুস্পষ্টভাবে জানতে চাওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, সাধারণ শারীরিক লক্ষণাদি (Physical Generals): রোগের নাম যাই হোক রোগী ভেদে এ পর্যায়ের লক্ষণ পৃথক হবেই। সাধারণত: যে সকল বিষয়ে জানা জরুরী তার একটি সংক্ষিপ্ত নমুনা উপস্থাপন করা হলোঃ

  1. ঠান্ডা/গরম বা তাপমাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধিতে লক্ষণের উপর প্রভাব,
  2. দিন-রাত্রির সুনির্দিষ্ট সময়ে লক্ষণাবলীর হ্রাস-বৃদ্ধি,
  3. অমাবস্যা-পূর্ণিমায় রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  4. অন্য যে কোন বিষয়/অবস্থায় লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  5. সুনির্দিষ্ট খাদ্য-পানীয়ের সাথে হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক,
  6. প্রসাব-পায়খানার সময় বা এর আগে-পরে লক্ষণের আবির্ভাব বা হ্রাস-বৃদ্ধি,
  7. চিৎ হয়ে শয়নে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  8. বাম বা ডান পার্শ্বে শয়নে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  9. মহিলাদের মাসিক চলাকালীন বা এর পূর্বে বা অব্যবহিত পরে কোন লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  10. নড়াচড়ার শুরুতে লক্ষণের প্রকাশ, হ্রাস-বৃদ্ধি,
  11. অবিরত চলতে থাকলে উপশম-বৃদ্ধি,
  12. অন্ধকারে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  13. বিদ্যুত চমকালে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  14. ভিজে গেলে তার প্রভাব,
  15. তীব্র গন্ধে সংবেদনশীলতা,
  16. শব্দে সংবেদনশীলতা,
  17. ব্যথায় সংবেদনশীলতা,
  18. মালিশ করলে লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  19. শরীর হতে সর্দি বা শেষ্মা নির্গমনে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  20. অত্যাবশ্যকীয় তরল যেমন- বীর্য, রক্ত বেরিয়ে যাবার ফল,
  21. ঘুমের পূর্বে, ঘুমের সময় বা ঘুম হতে উঠার পর লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  22. শরীরের রোগাক্রান্ত অংশে হালকা বা শক্ত চাপে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  23. স্পর্শ এমনকি সামান্যতম স্পর্শে রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  24. নিদ্রাহীনতার কারণে লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  25. রাতে একবার ঘুম ভেংগে যাবার পর নিদ্রাহীনতা,
  26. সুনির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভেংগে যায় কিনা,
  27. দাড়িয়ে থাকলে লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  28. সামনে দিকে মাথা নত করলে বা ঝুঁকলে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  29. ক্ষুধার কারণে দাড়াতে না পারা,
  30. ভারী কিছু উত্তোলনে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  31. ক্ষুধা বা আহারে রুচির হ্রাস-বৃদ্ধি,
  32. তীব্র পিপাসা বা পিপাসাহীনতা,
  33. ঘন ঘন অথচ সামান্য পানি পানের ইচছা…
  34. কোন নির্দিষ্ট খাবার-পানীয়ে বা অন্য কোন কিছুতে তীব্র আকাংখা (craving) বা তীব্র অনীহা (aversion),
  35. তীব্র অথচ সুনির্দিষ্ট কোন গন্ধযুক্ত ঘাম,
  36. সুনির্দিষ্ট অংগ প্রত্যঙ্গ ঘামা,
  37. ঘামে কাপড়ে দাগ লাগে কিনা, লাগলে তার রং, ধুলে দাগ উঠে কিনা,
  38. শারীরিক-মানসিক স্ট্রেস বা চাপের কারণে শরীর কাঁপে কিনা,
  39. শারীরিক পরিশ্রমে লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি,
  40. আবহাওয়ার পরিবর্তনে লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি।

তৃতীয়তঃ রোগের বৈশিষ্ট্যসূচক অসাধারণ লক্ষণ (Peculiar symptoms):

  1. শরীরের কোন পার্শ্ব আক্রান্ত..
  2. ক্ষুদ্র কোন স্পটে ব্যথা..
  3. ব্যথা শরীরের নানা স্থানে ঘুরে বেড়ায় কিনা বা স্থান পরিবর্তন করে কিনা,
  4. ব্যথার গতিপথ যেমন- উর্দ্ধমূখী, নিম্নমুখী, ডান উর্দ্ধ-বাম নিম্ন বা বাম উর্দ্ধ ডান নিম্ন (crosswise),
  5. জিহ্বার স্বাদের পরিবর্তনশীলতা যেমন- মিষ্টস্বাদ, টক, লবণাক্ত বা স্বাদগন্ধহীন (insipid),
  6. শেষ্মা-নির্গমণ (expectoration) হলে তার স্বাদ-গন্ধ,
  7. বিভিন্ন রোগেভোগের সময় মুখ, ঠোঁট ইত্যাদির রং পরিবর্তন। যেমন- নীলাভ (cyanosis যা ক্ষীন রক্ত সরবরাহ বা রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতার কারণে হয়ে থাকে) বা লাল বা ফ্যাকাশে লাগা,
  8. ব্যথাঃ হঠাৎ আসে ও হঠাৎ চলে যায়, হঠাৎ আসে ধীরে যায়, ধীরে ধীরে আসে হঠাৎ চলে যায় কিনা,
  9. শরীর থেকে কিছু নির্গমন হলে তার ধারাবাহিকতা, ঘনত্ব, রং, কটু বা ঝাঝালো গন্ধ (acrid), বা মৃদু বা গন্ধহীন (bland),
  10. অংগপ্রত্যংগ ঝুঁলিয়ে রাখলে বা উর্দ্ধে তুললে হ্রাস-বৃদ্ধি,
  11. খাবারের চিন্তা করলে, দেখলে বা গন্ধে বমিভাব (nausea) ইত্যাদি।

চতুর্থত, আনুষংগিক (concomitant) লক্ষণাবলী:

  1. সর্দির (coryza) সময়ে মাথাব্যথা,
  2. হাঁচি বা কাশির সময় অসাড়ে মুত্রত্যাগ.
  3. কাশির সময় বুক, মাথা, মলদ্বার, হাটু ইত্যাদির ব্যথা,
  4. দাঁত উঠার সময় খিঁচুনি বা তড়কা (convulsions)
  5. গরম আবহাওয়ায় খিঁচুনি,
  6. কাশতে কাশতে বমি করা,
  7. কাশতে কাশতে মুখমন্ডল লাল হয়ে যাওয়া,
  8. খিঁচুনির সময় অসাড়ে মুত্রত্যাগ,
  9. রজোবন্ধকালীন (menopause) খিঁচুনি ইত্যাদি।

পঞ্চমত, মানসিক লক্ষণ (Mind symptoms): হাজার হাজার মানসিক লক্ষণ হতে মাত্র কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলোঃ

  1. মানুষের সংগ পছন্দ না করা,
  2. মতের অমিল সহ্য করতে না পারা,
  3. সবাই তাকে পরিত্যাগ করেছে এমন অনুভূতি (forsaken /abandoned feeling)
  4. ঈর্ষা, হিংসা, ক্রোধ,
  5. অতীতের কোন বিষয়ে ডুবে থাকা,
  6. তীব্র অনুশোচনা (remorse),
  7. ক্ষুদ্র বিষয়েও মারাত্মক ন্যায়পরায়ণ বা বিবেকনিষ্ঠ (conscientious about trifles),
  8. চিত্তদাহ, সংযম, রিপুদমন, অপমান (Mortification),
  9. সামান্য কারণে ভয় পাওয়া,
  10. বাচালতা (loquacity),
  11. আত্মহত্যার চিন্তা (suicidal disposition),
  12. স্বৈরাচারী আচরণ (dictatorial),
  13. বিষাদ বা তীব্র শোক (grief),
  14. নির্ভীক বা সাহসী,
  15. বিদ্বেষপরায়ন বা আক্রোশপূর্ণ (malicious),
  16. পরিশ্রমী,
  17. সন্দেহপ্রবণ (suspicious),
  18. শিশুসুলভ (childish),
  19. দু:খবোধ হতে হতাশা (despair of miserable existence),
  20. কোমলতা (mildness),
  21. ভীরুস্বভাব (timidity) ইত্যাদি।

ষষ্ঠত, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস (Personal & family history):

রোগীর নিজের বা রক্ত সম্পর্কীত নিকটাত্মীয় অতীতে মারাত্মক কোন সুনির্দিষ্ট রোগে ভুগে থাকলে তা অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনে নিতে হবে। এর মধ্যে যা যা গুরুত্বপূর্ণঃ

  1. কোন কোন রোগে ভুগেছেন, রোগীর সাথে তাদের সম্পর্ক?
  2. রোগের প্রকৃতি,
  3. রোগাক্রান্তের তারিখ ও মেয়াদ,
  4. কতদিন ধরে কি প্রকার চিকিৎসা চলেছিল,
  5. চিকিৎসার ফলাফল,
  6. রোগভোগের পরিণতি বা জের (sequelae) ইত্যাদি।

সর্বশেষ, কোন কোন ক্ষেত্রে ল্যাবটেস্টেরও প্রয়োজন হতে পারে। তবে রোগ সম্পর্কে মূল তথ্য পাওয়া যায় রোগীর সাথে কথা বলে। ভেবে দেখুন তো হোমিওপ্যাথিতে একজন রোগীর কেস নিতে কত সময় লাগে? কেস স্টাডি তো পরের বিষয়!! লক্ষণের সাথে মিলিয়েই তো ওষুধের সন্ধান করতে হবে। কতটা ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে হয় হোমিওপ্যাথকে? এ্যালোপ্যাথিতে কত সময় দেন একজন ডাক্তার? ল্যাবটেস্টের বাইরে কি আদৌ কিছু জানতে চান তারা?

ডাঃ বেনজীর। হোমিওপ্যাথ। এ্যাপায়েন্টমেন্ট গ্রহণ সহ যে কোন প্রয়োজনে ফোন দিনঃ ০১৭৩৩৭৯৭২৫২। আরো জানতে ভিজিট করুনঃ drbenojir.com/contact/

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.