এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগের নাম রোগীর প্যাথলজি হতে উদ্ভূত। অর্থাৎ কেবল শারীরিক প্যাথলজি দেখেই রোগের নাম দেয়া হয়। প্যাথলজির ভিত্তিতে নির্ণীত রোগকে হোমিওপ্যাথিতে রোগের শেষ অবস্থা বা রোগের ফল হিসেবে গণ্য করা হয় যা মূলত: প্রাণশক্তিতে দীর্ঘস্থায়ী বিশংখলার বাহ্যিক দিক। এ্যালোপ্যাথিতে রোগ হলো শরীরের শক্তিস্তরের এক ধরণের বিশংখলা যা রোগীতে বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় (electromagnetic) পরিবর্তন ঘটিয়ে আনবিক মিথষ্ক্রিয়াকে (molecular interactions) প্রভাবিত করে যা শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণযোগ্য বা দৃশ্যমান হয়ে রিপোর্টে ধরা দেয়। সংগত কারণে এ্যালোপ্যাথিতে প্যাথলজির অপসারণকরেই রোগের আরোগ্য বলা হয়। এটি বোধগম্য, যেহেতু প্যাথলজি পর্যবেক্ষণযোগ্য। কিন্তু এ চিকিৎসার জের রোগীকে আজীবন ভোগায়।

এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি অদৃশ্য হয়ে যায়, আঁচিলকে পুড়িয়ে ফেলা হয়, টিউমার অপসারণ করা হয় অর্থাৎ এদের চিকিৎসায় লক্ষণসমূহ বা চিহ্ন অপসারিত হয়। কিন্তু হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় যেভাবে রোগীর শরীর-মন-আবেগ-আত্মা ইত্যাদির মধ্যে একটা আন্ত:সংযুক্ততা (interconnectedness) দেখতে পাওয়া যায় তার অস্তিত্ব এ্যালোপ্যাথিক ব্যবস্থায় নেই। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার গবেষণায় কখনও তাদের চিকিৎসার ফলে যে জটিল ক্রণিক রোগের সৃষ্টি হয় দেখা যায়না। উদারহরণস্বরূপ- তাদের চিকিৎসায় একজিমা চাঁপা পড়ে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, শ্বাসকষ্ট চিকিৎসার পর তা চাঁপা পড়ে খিঁচুনি (seizures) হয়, অথবা জেনিটাল ওয়ার্ট বা আঁচিল অপসারণের পর রোগী সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। সামান্য চুলকানি দূর হবার পর অবসন্নতা বা উদ্বেগের (depression or anxiety) আক্রমণের কথা না হয় বাদই দিলাম। উনিশ শতকের বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ Compton Burnett তার গবেষণায় প্রাপ্ত ফল থেকে প্রমাণ করেছেন শরীরের নানা স্থানের টিউমার (local tumor) অপসারণের ফলে তা বৃহৎ কোন না কোন অংগের জটিল টিউমারে রূপান্তরিত হয়েছে। এমনকি র‍্যাশ দমন করার ফলে অনেক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

হোমিও চিকিৎসা ব্যবস্থায় শরীর-মন-আবেগ ও আত্মার আন্ত:সংযোগকে গুরুত্ব দেয়া হয়। অধিকন্তু, রোগী আরোগ্যের জন্য এসব বিষয় হোমিওপ্যাথের হাতে শক্তিশালী কিছু সরঞ্জাম তুলে দেয়। সঠিক ওষুধটি রোগীর জীবনীশক্তিকে উদ্দীপিত করে তার হতাশা, উদ্বেগ, হাঁপানি, ত্বকের লক্ষণকে পুনরায় ফুটিয়ে তুলে এবং পর্যায়ক্রমে রোগীর সকল কষ্টকে দূরীভূত করে রোগীকে সার্বিক আরোগ্য দান করে। দুই শতাব্দীর ক্লিনিক্যাল গবেষণার মধ্য দিয়ে হোমিওপ্যাথেরা লক্ষ-কোটি রোগীর মন-দৈহিক সংযোগের সত্যতার প্রমাণ পেয়েছেন।

বস্তুগত লক্ষণ পর্যবেক্ষণ অর্থাৎ টেস্ট রিপোর্টের উপর নির্ভরতার ফলস্বরুপ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান মন, আবেগ ও আত্মার কথা বিবেচনা করেই না। অথচ, বহু রোগীর টেস্ট রিপোর্ট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন রোগে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এ মূহুর্তে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের দ্বারপ্রান্তে। রোগ নিরাময়ে এখন মন-আবেগ ও আত্মার ভূমিকা জোরেসোরে উচ্চারিত হতে শুরু করেছে। এ মুহুর্তে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্টান এসকল প্রমাণগুলি একত্রিত করছেনা না কারণ, তারা জানেন না এ সকল তথ্য নিয়ে তারা কতদুর কি করতে পারবেন বা এগুলো কতটা কিভাবে গ্রহণ করবেন। তবে শীঘ্রই বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গীর বর্তমান স্বাস্থ্য ও নিরাময় ব্যবস্থার পিছনে যে বিশ্বাস তাতে ফাটল ধরবে। এতে করে চুড়ান্তভাবে গ্রে’র এ্যানাটমি ও আণবিক (Gray’s Anatomy and molecular) মিথষ্ক্রিয়া সংক্রান্ত জ্ঞানের দুর্বলতা ও ভ্রান্তি প্রকাশিত হবে। আর যখন এমনটা ঘটবে তখন হোমিওপ্যাথি প্রস্তুত থাকবে: দুই শতাব্দী পূর্বে স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের দূরদর্শনীয় সৃষ্টি সেই হোমিওপ্যাথি আর্ত মানবতা কে উদ্ধার করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। কারণ, তখন রোগ নিরাময়ে জীবনীশক্তিকে শক্তিশালী করার কথাই কেবল বলা হবে যা হ্যানিম্যান আমাদের বহু পূর্বে জানিয়ে গেছেন। তখনও হয়তোবা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ”রোগীর ১০ বছর আগে তার প্রিয়তমা স্ত্রী মারা যাবার কারণে যে তার ক্যান্সার হয়েছে” এই বিশ্বাসকে উপেক্ষা করবেন কারণ এই তথ্য তার প্রেসক্রিপশনের জন্য কার্যকর নয়। হোমিওপ্যাথ রোগীর এই বিশ্বাসকে চুড়ান্তভাবে কার্যকর মনে করবেন। হোমিওপ্যাথ প্রেসক্রিপশনের পূর্বে ”রোগীর স্ত্রী বিয়োগজনিত জীবনীশক্তিতে যে ছিদ্র তৈরী হয়েছে যা পরবর্তীতে যে ক্যান্সারের কারণ” তা বিশ্লেষণ করবেন। “Ailments from grief” অর্থাৎ ”শোক থেকে অসুস্থতা”র জন্য যে কটি ওষুধ রয়েছে সেখানে থেকেই হোমিওপ্যাথ সার্বিক লক্ষণের ভিত্তিতে রোগীর ওষুধ নির্বাচন করবেন এবং তাকে নিরাময় করবেন। এমন হাজারো লক্ষণে সমৃদ্ধ হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা।

কোন রোগীর কাছে যখন এভাবে রোগ উৎপত্তির এ ধারণাটি উপস্থাপন করা হবে অর্থাৎ কখন রোগীর জীবনীশক্তি নামক এনার্জি ব্যালান্সে ছিদ্রটি হয়েছে তা জানতে চাওয়া হবে তখন রোগী তাৎক্ষণিকভাবে তার রোগের উৎপত্তির কারণটা বলতে পারবেন। উদাহারণস্বরূপ- একজন রোগী স্মরণ করবেন তার সেই দু:খজনক অনুভূতিটি কথা যখন ”প্রতিবেশীর ফোনে তার ১০ বছরের বাচ্চাটি স্কুল হতে ফেরার পথে গাড়ী দুর্ঘটনায় মারা যাবার সংবাদ পান”। তখন থেকেই তিনি অসুস্থ। আরেকজন বলবেন তার অনুভূতি ”যখন তার বিশ্বস্ততম বন্ধু ও ব্যবসায়িক পার্টনার তার সাথে বেঈমানী করে তাকে দেউলিয়া করে ফেলেছে”। আরেকজন তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলবেন, ”তার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে তার স্ত্রীর পরকীয়ার কাহিনী” কিভাবে তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। হয়তোবা আরেকজন তার দু:খের কাহিনী এভাবে বলবেন এভাবে- ”সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে চাকুরীতে পদোন্নতি না দিয়ে তার চেয়ে অথর্ব কোন চাটুকারকে ম্যানেজমেন্ট পদোন্নতি দিয়ে তার প্রতি যে অন্যায় করেছেন তা ভুলে যাবার নয়”। অধিকাংশ অনুভূতির ভেতর দিয়ে রোগীর জীবনীশক্তিতে এধরনের লিকেজ বা ছিদ্রের সন্ধান পাওয়া যাবে যার পর হতেই রোগী অসুস্থ। বিশেষত আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যা মোতাবেক ধার্য হওয়া অনারোগ্য ব্যাধি যেমন- ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ সহ শত শত রোগের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটছে।

আমরা কবে বুঝবো মন-আবেগ-আত্মার সাথে রোগের যোগসূত্র!!!

Dr. Benojir, 01733797252, drbenojir.com/contact/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *