ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর মতে, কোভিড -১৯ (করোনাভাইরাস) মহামারী। WHO এর সংজ্ঞা অনুসারে, বিশ্বব্যাপী যে কোনও নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ে তাকে মহামারী (pandemic) হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

এরকম ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে আমাদের প্রতিক্রিয়া কি হওয়া উচিত?

আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্লেগ মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ

এটি এমন আযাব যা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রেরণ করেন, কিন্তু এটা মুমিনদের জন্য রহমত। যে কোন বান্দা মহামারী দ্বারা জর্জরিত দেশে বাস করে, ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কারের প্রত্যাশায় থাকে এটা জেনেও যে আল্লাহর আদেশ ব্যতীত তার কিছুই ক্ষতি হবে না এবং এ অবস্থায় মারা যায়, তাকে শহীদ হিসাবে পুরষ্কার দেওয়া হবে। " (সহিহ আল-বুখারী)
 
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমরা এ হাদীসের আলোকে পাইঃ
 
·        এই মহামারীটি মুমিনদের জন্য একটি আশীর্বাদ,
·        একজন মুসলিম এ অবস্থায় তার পালনকর্তার সাথে, নিজের সাথে এবং অন্যের সাথে তাঁর সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করার জন্য এই সুযোগটি গ্রহণ করেন,
·        তিনি জানেন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাগুলি তাঁর রবের নিকটবর্তী হওয়ার এবং বিভিন্নভাবে নিজেকে উন্নত করার উপায়,
·        আজকের মতো মহামারীতে একজন মুসলিম যে বিষয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন সেগুলিতে মনোনিবেশ করতে শিখেন এবং বাকী অংশটি আল্লাহ্ সুবহানাওয়াতালার উপর ছেড়ে দেন।


আপনি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অনেকগুলি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবশ্যই ইতোমধ্যে পেয়েছেন যেমন – আপনার হাত ভালভাবে ধুয়ে নেয়া এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। অতএব, আজকের নিবন্ধে, আমি আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত করার জন্য আপনাকে অতিরিক্ত ৬টি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার কথা বলতে চাই।

আপনার প্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system) উন্নত করার জন্য এখানে পাঁচটি উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ 
# ১ বেশী বেশী দু’আ করাঃ
দু‘আ হ'ল একজন বিশ্বাসীর অস্ত্র। আগের চেয়ে এখন আমাদের এই অস্ত্রটি আরও বেশি ব্যবহার করা দরকার।
যদিও আমরা এই রোগ থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য আল্লাহকে নিকট অনুনয় বিনয় করি। আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি উন্নত করার জন্য আমাদের একমাত্র আল্লাহ তা'আলাকেই অনুরোধ করা উচিত।
 
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি সকালে নিম্নলিখিত দু’আ তিন বার তেলাওয়াত করে, তার সন্ধ্যার আগে কোনও বিপর্যয় ঘটবে না এবং যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এটি তিনবার পাঠ করবে সে সকালের আগে কোন দুর্যোগের কবলে পড়বে না:

”বিস্‌মিল্লা-হিল্লাযী লা ইয়াদ্বুররু মা‘আ ইস্‌মিহী শাইউন ফিল্ আরদ্বি ওয়ালা ফিস্ সামা-ই, ওয়াহুয়াস্ সামী‘উল ‘আলীম” (অর্থঃ “আল্লাহ্‌র নামে; যাঁর নামের সাথে আসমান ও যমীনে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি  সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।”)

সূত্রঃ আবূ দাউদ, ৪/৩২৩, নং ৫০৮৮; তিরমিযী, ৫/৪৬৫, নং ৩৩৮৮; ইবন মাজাহ, নং ৩৮৬৯; আহমাদ, নং ৪৪৬।


# ২ পর্যাপ্ত ঘুমঃ

পর্যাপ্ত ঘুম আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system) কে উন্নত করে। একটি স্টাডি আমাদের নিশ্চিত করে যে ঘুমের অভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি হ'ল আপনার প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে আমরা যদি রোজ রাতে ৪ ঘন্টা বা তার কম ঘুমাই তো সেটা আমাদের প্রাকৃতিক ঘাতক কোষের (natural killer cell) ক্রিয়াকলাপকে ৭২% - এ নিয়ে আসে।
 
আপনার প্রাকৃতিক ঘাতক কোষগুলি আপনার ইমিউন প্রতিরক্ষা অস্ত্রাগারগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই হত্যাকারী কোষগুলি মারাত্মক কোষগুলি সনাক্ত এবং ধ্বংস করার জন্য দায়ী। প্রাকৃতিক ঘাতক কোষগুলি ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহজাত কোষ। 
 
স্বাস্থ্যকর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের রোজ সর্বনিম্ন ৭ ঘন্টা ঘুমানো উচিত। 
# ৩ স্ট্রেস ব্যবস্থাপনাঃ
স্ট্রেস বা চাপ হ'ল জীবনের ক্রমবর্ধমান দাবির প্রতি একটি মানসিক এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়া যা আমরা প্রত্যেকে আমাদের জীবনের কোন না কোনও সময়ে পার করি। যাইহোক, যখন চাপ ক্রনিকে পরিণত হয়, তখন এটি আমাদের ক্ষতির কারণ হয়। দীর্ঘমেয়াদী চাপ আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
একটি গবেষণায় গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন যে সামান্য তিন দিনের পরীক্ষার সময়কালের সাধারণ চাপের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাকৃতিক ঘাতক কোষগুলি কম ছিল, যা টিউমার এবং ভাইরাল সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তারা প্রায় অনাক্রম্যতা-বৃদ্ধিকারী গামা ইন্টারফেরন উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিল এবং সংক্রমণ-লড়াইকারী টি-কোষগুলি টেস্ট-টিউব উদ্দীপনাটির জন্য কেবল দুর্বল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।
 
এখন ভেবে দেখুন যে লোকেরা ক্রমাগত করোনভাইরাস সংক্রান্ত সংবাদ অনুসরণ করে তাদের কী ঘটে? তাদের স্ট্রেসের স্তরটি খুব বেশি হতে পারে যা তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাতে নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
 
আমাদের দুনিয়া এবং আখিরার জন্য উপকারী এমন জিনিসগুলি ব্যতিত সকল সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে সম্পর্ক হ্রাস করা উচিত। দু’আ, ইবাদত, জিকির, ইসতিগফারে অধিক সময় কাটানো উচিত। 
 
# ৪ নিয়মিত শরীরচর্চাঃ
আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও উন্নত করার অন্যতম দ্রুত উপায় হল নিয়মিত ব্যায়াম করা। যখন আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করার কথা আসে, দুর্ভাগ্যক্রমে, তখন ব্যায়ামের গুরুত্ব কম দেখানো হয়। 

নির্দ্বিধায় বলা যায় নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। তাই সপ্তাহে সর্বনিম্ন ৫ দিনের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ মিনিট কিছু শরীরচর্চা করার চেষ্টা করি। এমনকি সাধারণ হাঁটাচলা, জগিং, সাঁতার, যোগ বা অন্য কোনও ধরণের অনুশীলন আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

# ৫ স্বাস্থকর খাদ্যগ্রহণঃ
স্বাস্থ্যকর খাওয়া আগের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি এবং ফলমূল খেতে হবে। এগুলি প্রকৃতির নিজস্ব ওষুধ ভান্ডার (medicine cabinet)। তাই দিনে সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে সাতটি ভাগে অল্প অল্প করে এসব খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সাধারণভাবে, পুরো খাবার (whole foods) খেতে হবে এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলি এড়িয়ে চলতে হবে। এখানে ৩ টি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করা উচিত। (১) যেকোন ধরণের প্যাকেটজাতও বা প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিত্যাগ করা উচিত। (২) সব ধরণের সিজন্যাল শাক-সবজী, ফলমুল খাওয়া উচিত এবং (৩) স্থানীয়ভাবে যে সকল খাদ্য সামগ্রী উৎপাদিত হয় তা খাওয়া উচিত। দুর হতে আসা বা বিদেশী খাবার পরিতাজ্য।
 

# ৬ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণঃ

হোমিওপ্যাথি লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা। করোনা যদিও মহামারী আকারে দেখা দিচ্ছে তবুও প্রতিটি রোগীর ভেতর আক্রান্ত লক্ষণের সামান্য হলেও তারতম্য থাকতে পারে। এ কারণে একজন রেগীর সার্বিক লক্ষণ অন্য সকলের চেয়ে পৃথক হওয়ারই সম্ভাবনা অধিক। এই স্বাতন্ত্রীকরণের জন্য অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ সঠিকভাবে রোগীর কেস নিবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি রোগীর, যার জন্য যে ওষুধ নির্বাচিত হবে কেবল তাই প্রয়োগ করবেন। আল্লাহ্ চাইলে এতে আক্রান্ত রোগীরা রোগমুক্ত হবেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন। ভয়াবহ দুর্যোগ হতে আমাদের পরিত্রাণ দিন। আমীন।

ডাঃ বেনজীর, ফোন (+444704865695) বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: drbenojir.com/contact/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *