সিস্টাইটিস(Cystitis): এটি মুত্রতন্ত্র বিশেষত ব্লাডারের ইনফেকশন জনিত একটি সাধারণ রোগ। এর আরেক নাম Urinary Tract Infection (UTI)। সাধারণভাবে একে অনেকেই প্রস্রাবের ইনফেকশন বলে থাকেন। ঘন ঘন যন্ত্রণাদায়ক প্রসাব হওয়া এর প্রধান লক্ষণ। এ রোগের জন্য ৪৯ টি হোমিও ওষুধ আছে। রোগীর লক্ষণভেদে যে কোন একটি ওষুধ দিয়ে রোগীর কষ্টের দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান সম্ভব। আজ এ রোগের প্রধান লক্ষণ নিয়ে আলোচনা করবো।  হোমিওপ্যাথিতে কখনও এ্যালোপ্যাথিকের ন্যায় কেবল রিপোর্ট নির্ভর ডায়গনসিস করা হয়না। রোগীকে অন্য রোগী হতে আলাদা করতে প্রতিটি রোগীর নিজস্ব লক্ষণের ভিত্তিতে তাকে স্বাতন্ত্রীকরণ করতে হয়। রোগীর লক্ষণ স্পষ্টভাবে পাওয়া গেলে ল্যাব টেস্টের কোন দরকার হয়না। বাংলাদেশে রোগটি প্রকট। বিস্তারিত লক্ষণসমূহ নিম্নরূপ:

মূত্রত্যাগের_লক্ষণাবলী: কষ্টকর মূত্রত্যাগ। কিছু রোগী মূত্রত্যাগ শুরু করতেই অনেক সময় নেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর হাটুর সাথে মাথা চেপে ধরলে মূত্রত্যাগ হয়। কারো বা পা ফাঁকা করে দাড়িয়ে এবং শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দাড়ালে মূত্রত্যাগ সম্ভব। নববিবাহিতার ক্ষেত্রে এ রোগ দেখা দেয়া যাকে আমরা honeymoon cystitis বলে থাকি। প্রথম সহবাসের পর অনেক নববধু এ রোগে আক্রান্ত হন।

কিছু রোগী বসে থাকলে ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব হয় অথচ উঠে দাড়ালে স্বাভাবিক মূত্রত্যাগ করতে পারেন। মূত্রত্যাগের পরেও অনেকের ফোঁটা ফোঁটা পড়তে থাকে।

বহু রোগীর একাধিক ধারায় মূত্র প্রবাহিত (forked/ split stream) হয়। মূত্রত্যাগের পর মনে হয় আরো মূত্র রয়ে গেছে। ব্লাডার খালি করার জন্য অনেকে ৫/৬ বার অনবরত মূত্রত্যাগের চেষ্টা করেন। অনেক রোগী অসাড়ে মূত্রত্যাগ করে ফেলেন। সেক্ষেত্রে মূত্র গড়িয়ে বেরিয়ে যায়। রোগী যে মূত্রত্যাগ করছে এ বোধটাও রোগীর ভেতর কাজ করেনা।

কিছু রোগীর মূত্ররোধ বা প্রসাব আটকে থাকার সমস্যা (retention of urine) বিশেষত: নবজাতকের। মাথা পেছন দিকে নিলে মূত্রত্যাগ হয়। ঠান্ডা লেগে রোগীর এ অবস্থা হতে পারে। যা অনেকক্ষেত্রে বেদনাদায়ক হতে পারে। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলে কেবল মূত্রত্যাগের বেগ হয়। কারো পা পানিতে ভিজে বা অনেকক্ষণ পানিতে কাজ করলে মূত্ররোধ হতে পারে। এ অবস্থায় মলত্যাগের বেগও থাকতে পারে।

প্রস্রাব করে অনেকের সন্তুষ্টি আসেনা। মনে হয় মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি। যে কারণে প্রস্রাব গড়িয়ে পড়ে। মনে হয় কিছু প্রস্রাব মূত্রনালীতে (urethra) রয়েছে।

মূত্রের_বেগ(Urging_to_Urinate): এটা একটা বেদনাদায়ক লক্ষণ। রোগীর ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসে। কিন্তু প্রস্রাব করতে গেলে হয়না। এটা অব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। কখনও বা এমন হয় যে বেগ আসামাত্র প্রস্রাব না করলে কিছু প্রস্রাব বেরিয়ে কাপড় নষ্ট হয়। মনে হয় তলপেটে কিছু একটা নেমে আসছে। অবিরত প্রস্রাবের বেগ। কিছু রোগীর একটি বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণ হলো প্রস্রাবের পরিমাণ যত কমতে থাকে প্রস্রাব ত্যাগের বেগ ততো বাড়তে থাকে। চিৎ হয়ে শয়নে প্রস্রাবের বেগ হয়। হঠাৎ প্রস্রাবের বেগ। ঝর্ণা বা পানির প্রবাহ (running water) দেখলেই প্রস্রাব করতে মন চায়। মূত্রত্যাগের পর পরই আবার মূত্রের চাপ অনুভূত হয়।

সিস্টাইটিসে রোগীর মূত্রনালী, ব্লাডার ও কিডনীর লক্ষণও থাকতে পারে। যেমন:

মূত্রনালীর_লক্ষণ(Urethra Symptoms): প্রস্রাবের নালীতে ব্যথা। ব্যথা পিছন দিকে প্রসারিত হয়। জ্বালাকর ব্যথা। মাঝে মধ্যে বা অবিরত জ্বালাকর ব্যথা। রাতের বেলায় অধিক জ্বালা। মনে হয় কেটে ফেলার (cutting) মত ব্যথা। অনেক সময় জ্বালার তীব্রতা এত যে মূত্রত্যাগের সময় রোগী কেঁদে ফেলেন। ছিড়ে ফেলার মত ব্যথা (tearing pain)। প্রস্রাবের নালীতে চুলকানি। যা চুলকালে ইন্দ্রিয়সুখ (voluptuous) লাভ হয় ।

মূত্রথলির_লক্ষণ(Bladder symptoms): ব্যথাটি জ্বালাকর, জ্বালা মূত্রনালী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ব্লাডার সংকুচিত হওয়ার অনুভূতি সহ ব্যথা। ব্যথাটি কারো ক্ষেত্রে কেটে ফেলার মত যা মূত্রনালী পর্যন্ত প্রসারিত হয়। অনেকের খিঁচে ধরার মত ব্যথা (cramping pain)। ব্যথাসহ ব্লাডারে চাপ বোধ। থেতলে যাবার মত ব্যথা। ব্যথাটি মূত্রথলি হতে মূত্রনালী পর্যন্ত নেমে আসে। কখনও বা ব্যথাটি কিডনী কিংবা উরু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কারো বা নাভীর চারপাশে কেটে ফেলার মত ব্যথা অনুভূত হয়।

মূত্রত্যাগের পরও ব্লাডার পূর্ণ মনে হয়। এ অবস্থায় অনেকের প্রস্রাবের বেগ থাকেনা। তবে ব্লাডার ভারী ভারী বোধ হয়। মনে হয় ব্লাডারে একটি বলের মত কিছু আছে। কিডনী এলাকায় একধরণের বুদবুদ বা টগবগ (bubbling) করার মত অনুভূতি কাজ করে।

কিডনির_লক্ষণ(Kidney Symptoms): ডান কিডনীতে ব্যথা। কিডনীর ব্যথা ব্লাডারে প্রসারিত হয়। কিডনীতে জ্বালা করে। কিডনীর ব্যথা মূত্রনালীতে ছড়িয়ে পড়ে।

লক্ষণের_হ্রাসবৃদ্ধি(Modalities): হ্রাস-বৃদ্ধিকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়:

মূত্রনালীর_হ্রাসবৃদ্ধির_লক্ষণ: যখন প্রস্রাব হয়না তখন, প্রস্রাবের সময় এবং যখন সময় মলত্যাগের বেগ হয় তখন ব্যথা। মূত্রত্যাগের পর মূত্রনালীতে ব্যথা। মূত্রত্যাগের পূর্বে মুহুর্তে মূত্রনালীর ব্যথা। অনেকের ব্যথাটি জ্বালাকর যা প্রস্যাব ত্যাগের পর উপশম হয়, কারো বা প্রস্রাব ত্যাগের আগেই বা ত্যাগকালীন বা প্রস্রাব ত্যাগ করার পর জ্বালা করে। প্রস্রাবের শুরুতেই বা ঠিক পূর্ব মুহুর্তে জ্বালাকর ব্যথা। কারো বা শেষ ফোঁটাটি বের হবার সময় তীব্র যন্ত্রণা করে। মূত্রত্যাগের পূর্বে, সময়ে বা পরে কেটে ফেলার মত ব্যথা।

মূত্রথলির_হ্রাসবৃদ্ধির লক্ষণ: প্রস্রাব ত্যাগ করার উদ্যোগ নিলেই ব্যথা। প্রস্রাব চেপে গেলেও ব্যথা। কাঁশি দিলে, ঝাঁকুনি লাগলে, চলাফেরা করলে ব্যথা। প্রস্রাব না করার সময়েও ব্যথা থাকে কারো কারো। কয়েক ফোঁটা প্রস্রাবের পর যন্ত্রণা। প্রস্রাবের শুরুতে, পূর্ব মুহুর্তে ব্যথা থাকে অনেকের। জ্বালাকর ব্যথা প্রস্রাবের পূর্বে, সময়ে বা পরে। অনেকের জ্বালা মুক্ত বাতাসে চলাফেরায় উপশম। প্রস্রাবের পূর্বে, সময়ে বা পরে কেটে ফেলার মত ব্যথা।

কিডনীর_হ্রাসবৃদ্ধির লক্ষণ: কিডনীতে ব্যথা যা মূত্রত্যাগের পর উপশম হয়। অন্য যে কোন লক্ষণ থাকতে পারে।

মূত্রের_বৈশিষ্ট্য(Urine_Character): উগ্র ঝাঝালো (acrid) গন্ধ। এ্যালুবিউমিন সদৃশ গন্ধ (aluminous)। রক্তমেশানো (bloody) প্রস্রাব। গরম জ্বালাকর (burning hot) প্রস্রাব। মেঘলা প্রস্রাব (cloudy), ফেনাসদৃশ (frothy) প্রস্রাব। ধুয়াসদৃশ (smoky), ঘন প্রস্রাব,। প্রস্রাবের দুর্গন্ধ যেমন- ঘোড়ার মূত্রের ন্যায়। টকজাতীয় গন্ধ। মূত্রের পরিমাণ কম। প্রস্রাবের তলানি/গাদ (sediment) পড়ে। কারো বা প্রচুর পরিমাণে প্রস্রাব হয়। কারো মূত্রে শ্লেষ্মা (mucus) পাওয়া যায়।

রোগের_কারণ(Aetiology): ঠান্ডা লেগে বা ঠান্ডার সংস্পর্শে এসে। সহবাসের পর, ক্যাথেটার ব্যবহার করার পর (catheterization), কোন আঘাত প্রাপ্তির পর, মূত্রবেগ অধিকঘন চেপে রাখার পর। অনেকের পানি কম পান করার ফলেও লক্ষণ দেখা দেয়।

আনুষংগিক_লক্ষণ(Accompanied Symptoms): ব্লাডারের ষ্শেষ্মা। মূত্রত্যাগের আগে, সময়ে বা পরে শীতার্ত বোধ। মূত্রত্যাগের পর পিঠে শীতবোধ। ব্লাডারে মুখে শীতবোধ যা প্রস্রাব ত্যাগের পর উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মূত্রবেগ হওয়া মাত্রই শীতবোধ। মূত্রত্যাগের চেষ্টাকালে পায়ে খিল ধরে। ব্লাডার অধিক স্ফীত হয়ে ব্লাডারের পক্ষাঘাত। যৌনাকাংখাসহ ব্লাডারের খিচুনি। বিশেষত মূত্রত্যাগের পূর্বে। মূত্রনালীর মুখটি প্রসাব শেষ হওয়ার সময় খিচুনি দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। পুরুষের প্রস্টেট গ্লান্ডের বৃদ্ধি।

উপসংহার: রোগীর বিস্তারিত কেস টেকিং এর সময় রোগীবিশেষে ৫/৭ টি লক্ষণ পাওয়া যায়। ক্ল্যাসিক্যাল হোমিও চিকিৎসায় রোগীর স্থায়ী চিকিৎসা হয়। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ন্যায় রোগ বার বার ফিরে আসেনা এবং এ্যান্টিবায়োটিকের পুন: পুন: প্রয়োগের রোগীর অবস্থাও জটিল হয়না।

Dr. Benojir, Homeopath, For more info please CLICK here

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.