আইবিএসের হোমিও বনাম এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা

আজ আলোচনার বিষয় আইবিএস বা Irritable Bowel Syndrom (IBS) এর চিকিৎসা সম্পর্কে। প্রথমেই আইবিএসের বিষয়ে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করবো। 

The medical perspective on Irritable Bowel Syndrom or IBS

Irritable Bowel Syndrome (IBS or Spastic Colon) একটি লক্ষণভিত্তিক ডায়গনসিস। এ রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য ক্রণিক পেটব্যথা (chronic abdominal pain),  অস্বস্তি (discomfort) পেট ফাঁপা (bloating), বিভিন্ন ধরণের মলত্যাগে (alteration of bowel)। আইবিএসের কোন জ্ঞাত অর্গানিক কারণ (known organic cause) নাই তবে এটি একটি কার্যগত মলত্যাগের বিশৃংখলা (functional bowel disorder)। আইবিএসে ডায়রিয়া (diarrhea) ও কোষ্ঠকাঠিন্যের constipation) প্রাধান্য (predominate) অথবা লক্ষণ ২টি পর্যায়ক্রমে আসে (alternate)। মেডিকেল ডাক্তাররা আইবিএসকে IBS-D, IBS-C or IBS-A শ্রেনীতে ভাগ করে থাকেন।

ঐতিহাসিকভাবে diagnosis of exclusion এর ভিত্তিতে আইবিএস নির্ণয় করা হয়। তবে ইদানীং লক্ষণের উপর ভিত্তি করেই ডাক্তাররা বলে দেন এটা IBS। ওজন হ্রাস (weight loss) স্থুল হেমাটোকেজিয়া (gross hematochezia), কোলাইটিসের পদ্ধতিগত সংক্রমণ (systemic infection or colitis), প্রদাহজনিত পেটের অসুখের (inflammatory bowel disease) ইতিহাস থাকে আইবিএস রোগীর। অনেক সময় কোন সংক্রমণের পরই আইবিএসের শুরুটা হতে দেখা যায় (Post infection, IBS -PI)। প্রচন্ড মানসিক চাপেও (stressful life events) আইবিএস হতে দেখা যায়।

আইবিএসের সাথে আরও কিছু রোগ বা উপসর্গ দেখা যায় যেমন- সিলিয়াক রোগ (coeliac disease), intoleration of fructose, মৃদু প্রদাহ (mild infection)। এছাড়া রোগীর অন্ত্র কিছু উদ্দীপনায় সংবেদনশীল হতে পারে। আইবিএসের সঠিক কারণটি এখনও অজ্ঞাত। রোগীর অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতাও থাকতে পারে বলে ডাক্তাররা মনে করেন।

এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় আইবিএস অনারোগ্য (incurable)। চিকিৎসার একমাত্র লক্ষ্য রোগীর কষ্ট কিছুটা কমানো বা উপশম দেয়া; আরোগ্য নয়। এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তাররা যে সকল ওষুধ সচরাচর প্রয়োগ করেন সেগুলো হলো: Alosetron (Lotronex). Eluxadoline (Viberzi), Rifaximin (Xifaxan), Lubiprostone (Amitiza), Linaclotide (Linzess)। এছাড়া ডাক্তার খাদ্য তালিকা সমন্বয় (dietary adjustment) করে, মানসিক সাপোর্ট বা কাউন্সেলিং করে (psychological intervention) রোগীর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। অনারোগ্য এ রোগের ওষুধ বন্ধ করলেই লক্ষণ পুন: পুন: নতুন জটিলতাসহ ফিরে আসে। ডাক্তার জীবনব্যাপী চিকিৎসা নেয়ার কথা বলেন।

অন্যান্য রোগের উপস্থিতি (comorbidities)

আইবিএস রোগের সাথে আরো কিছু শারীরিক সমস্যা ও লক্ষণ দেখা যায় যেমন – যেমন মাথাব্যথা, শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশী ও হাড়ে ব্যথা (fibromyalgia), প্রদাহজনিত পেটের পীড়া (inflammatory bowel disease-IBD) ইত্যাদি। 

আইবিএসের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা (Homeopathic Treatment of IBS)

একটি আইবিএসের রোগীর লক্ষণাবলী সংগ্রহ, তা বিশ্লেষণ ও সবশেষে ওষুধ প্রদানের বিষয়টি উপস্থাপন করলে হোমিওপ্যাথিতে কিভাবে আইবিএসের চিকিৎসা দেয়া হয় সে ধারণা স্পষ্ট হবে। বলা প্রয়োজন, অন্যান্য সকল রোগের ন্যায় আইবিএসে আক্রান্ত প্রতিটি রোগীর লক্ষণাবলী ভিন্ন, তার চিকিৎসাও ভিন্ন হবে। রোগী কিভাবে অন্য আইবিএস রোগী থেকে পৃথক ও অনন্য (different & unique) তা জানাই চ্যালেঞ্জ। হোমিওপ্যাথ একই  জাতীয় রোগীদের মধ্যে মিল নয় বরং অমিলটাই খুঁজেন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নির্ণয়ই (individualization) মুল কথা।

কেস: এটি আইবিএসের একজন পুরুষ রোগীর। রোগী ২ বছর ধরে আইবিএসে ভুগছেন। তিনি ১ বছর ধরে মাথাব্যথাতেও ভুগছিলেন। কেসটি আমার নিকট জটিল মনে হয়নি। যদিও অধিকাংশ আইবিএস রোগী সকল চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়েই হোমিওপ্যাথের দারস্থ হন। তাই বলে ওষুধ নির্বাচন কখনও সহজ প্রক্রিয়া নয়।

রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা হতে জানা যায় তিনি কঠোর পরিশ্রমী। তিনি ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে তা পারেন নি। তিনি একটি শিশু হাসপাতালে কাজ করেন। তিনি সেখানে তার নির্দিষ্ট কাজের বাইরেও অনেক কিছু জানতেও ও করার চেষ্টা করতেন । তিনি টেস্ট রিপোর্ট বুঝতেন। তিনি সকাল ৮টা হতে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং মাসে ৪/৫ দিন রাতেও কাজ করেন।  ডাক্তার হতে না পারলেও মেডিকেল পেশার প্রতি তার একটি ভালবাসা ছিল। 

Patient’s History (রোগীর ইতিহাস)

তিনি ডায়রিয়ার কথা বলেই শুরু করেন। ২ বছর ধরে তার এ সমস্যা। মূলত: ameobiasis এর প্যাথলজি ধরেই তার চিকিৎসা করেন এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার। কিন্তু চিকিৎসায় সাময়িক উপশম ব্যতিত কোন ফল হয়নি। রোগীর এই সময়ে ৮/৯ কেজি ওজন হ্রাস পেয়েছে। আনুষংগিক লক্ষণ (comorbidities) হিসেবে রোগী মাথাব্যথা ও ডিপ্রেশনের কথা বলেন যা তার পুরো ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলেছে।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা (Homeopathic treatment) 

প্রধান সমস্যা (Chief Complaint)

২ বছর ধরে গ্যাসট্রিকের সমস্যা (gastric disturbance), রোগ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয় (gradual onset), মলবেগ আসলে দ্রুত মলত্যাগ করতে  হয় (urgency for stool), কিছু খাওয়া মাত্রই মলত্যাগের বেগ (urge for stool as soon as eating anything), এমনকি কোন পানীয় পান করলেও মলবেগ আসে। পায়খানা পানির মত (watery) হলুদাভ (yellowish), পঁচা ডিমের ন্যায় দুর্গন্ধ (offensive like rotten eggs)। রোগীকে দিনে ১৫-১৬, রাতে ৩-৫ বার মলত্যাগ করতে হয়। এছাড়া পেটফাঁপা বোধ (bloated sensation), পাকস্থলীতে এসিডিটি জনিত যন্ত্রণা (heartburn)। ঢেঁকুর (eructation) উঠে কিন্তু কোন গন্ধ/স্বাদ নাই। দিনে ৬-৭ বার ঢেুঁকুর উঠে। রোগের বৃদ্ধি (aggravation):  দুধে, তৈলাক্ত ও মশলাযুক্ত খাবারে, ডিমে খেলে, চা-পান করলে, ভোরে বিশেষত: ঘুম থেকে উঠলেই মলবেগ, পানি পান করলে, সামান্য চলাফেরায়। উপশম (amelioration):   ঘুমের সময়, রাতে, রুটি খেলে, দুপুর ১২-৪ টার ভেতর, ডান পার্শ্বে শয়নে।

আনুষংগিক লক্ষণাবলী (accompanying symptoms)

  1. ১ বছর ধরে: ধীরে ধীরে ব্যথা আসে ও ধীরে ধীরে যায়। ২ মাস ধরে চশমা ব্যবহার করছেন। ব্যথার স্থায়ীত্ব (duration)- ৩০ মিনিট হতে এক ঘন্টা। দিনে দিনে ব্যথার তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাথার সম্মুখে (frontal), মাথার চুড়ায় (vertex), টেম্পরাল (temporal) এলাকায় ব্যথা। অনুভূতি (sensation) – টনটন করে ব্যথায় (throbbing pain), তীব্র ব্যথায় মাথা দেয়ালে ঠুকতে চায় রোগী। বেদনার বৃদ্ধি– মনোযোগ দিয়ে কোন কাজ করলে, শব্দে, উত্তেজিত হলে, ভোরবেলায়, ঘুমের পরে, সকাল ৭-৮ টায় ঘুম হতে উঠার পর হতে বিকেল পর্যন্ত। উপশম বিশ্রাম বা আরাম করলে (relax), চোখ বন্ধ করলে, চিৎ হয়ে শয়নে, ফ্যানের বাতাসে।
  2. : খাবার-দাবার মিশ্র, ক্ষুধা মাঝারি টাইপের, রোগী ক্ষুধা সহ্য করতে পারে। খবার পছন্দ– ভাত+++, দুধ+++ ও দুধের তৈরি খাবার, মিষ্টি জাতীয় খাবার++, আইসক্রীম+। অপছন্দ– মশলাজাতীয় ও লবনাক্ত খাবার। রোগলক্ষণ বৃদ্ধি পায়– মশলাদার খাবার, দুধজাতীয় খাবার ও তৈলাক্ত খাবারে। 
  3. – রোজ কমবেশী ২ লিটার পানিপান করেন, মুখে শুষ্কভাব, জিহ্বা শুষ্ক ও সাদা লেপাবৃত (white coated), এসিটিডির কারণে বুক ও পাকস্থলীতে জ্বালা। পেটের লক্ষণ: এসিটিডি দেখা দেয়া দুপুর ১-৩ টার দিকে। মল: ডায়রিয়ার ভাব (loose motion), ঘাম (perspiration) পরিমাণে প্রচুর ও দুর্গন্ধযুক্ত, ঘামে কাপড়ে সাদা দাগ লাগে, চোখের উপরে ও নীচে অধিক ঘামে। ঘুম: ৭ ঘন্টা ঘুমান যদিও একটানা নয়। ৩:৩০ টার দিকে ঘুম ভেংগে যায় আবার ৪:৩০ হতে ৭-৮টা পর্যন্ত ঘুমান। বাম পার্শ্বে শয়ন করেন। ঘুমে উপশম হলেও কিছুক্ষণ পর মাথাব্যথা শুরু হয়। ১ টি বালিশে ঘুমালে ভাল বোধ করেন। রোগী গরমে কষ্ট পান।
  4. : ছোট বেলা সম্পর্কে জানতে চাইলে রোগী জানান তিনি গ্রামে বড় হয়েছেন। লেখাপড়ায় ভাল হলেও আর্থিক অবস্থা ততোট ভাল ছিলনা বিধায় ডাক্তারি পড়তে চেয়ে পারেননি বলে আফসোস করেন এখনও। রোগী নরম স্বভাবের (mild। মানুষের সঙ্গ খুব একটা পছন্দ করতেন না। পছন্দের মাত্র কয়েকজন বন্ধু ছিল। তিনি রাগান্বিত হতেন অল্পতেই বিশেষ করে কেউ তার মতের বিরুদ্ধে কিছু করলে বা বললে বা সমালোচনা করলে সেসব পছন্দ করতেন না। 
  5. : ৩ বছর আগে বিয়ে করেছেন। ২টি সন্তান। একটি জন্মের ৩ দিন পর মারা যায়। তাতে তার কেন দু:খবো নাই। যৌথ পরিবারে বাস করেন। বর্তমানে তিনি একটি শিশু হাসপাতালে কাজ করেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে। 
  6. : মৃদু স্বভাবের। কেউ উত্যক্ত বা সমালোচনা করলে বা মতের বিরুদ্ধে কিছু করলে বিরক্ত বোধ করেন। কর্মক্ষেত্রে এসব ঘটনা প্রায়শ:ই ঘটে কিন্তু তিনি সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কর্তৃপক্ষকে নালিশ করেন যাতে তারা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেন। অনেক মানুষের ভেতর থাকা ততোটা পছন্দ করেন না। কেউ তাকে স্বাত্বনা দিক তাও পছন্দ না। তার খুব কম বন্ধু আছে কিন্তু এতেই তিনি ভালবোধ করেন। পরিবারের বাইরে কারো সাথে তেমন কিছু শেয়ার করেন না। পরিচ্ছন্নতা ও সমায়ানুবর্তিতা পছন্দ করেন। কোন বিষয়ে দু:শ্চিন্তা করেন জানতে চাইলে বলেন: ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা। বেশী লেখাপড়া করতে পারেননি বলে দু:খবোধ। খুব অল্প বয়সে চাকুরি শুরু করেন। কঠৈার পরিশ্রম করে একটি ব্যবসা দাড় করাতে চান। এখন সারাক্ষণ এই চিন্তা করেন।  

সার্বিক লক্ষণাবলী (totality of symptoms):

১. রোগী পরিশ্রমী (industrious), ২. উচ্চাকাংখী (ambitious), ৩. সংবেদনশীলতার অভাব (lack of sensitiveness), ৪. অতিরিক্র মলত্যাগ ( সামান্য চলাফেরায় বৃদ্ধি) (increased bowel activity, agg by slightest motion), ৫. হাটাহাটি করলে বৃদ্ধি  (motion aggravates), ৬. বিশ্রামে ও ঘুমের পর বৃদ্ধি ৭. মল দুর্গন্ধযুক্ত (stool offensive), ৭. কেবল চোখের পাশে ঘামে (perspiration single parts), ৮.  উচ্ছাকাংখী ও উদ্বিগ্নতা হতে রোগ (ailments from: ambition, anxiety), ৯. নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্নতা (anxiety planning new business), ১০. রোগী গরমকাতর (thermal: hot),  ওষুধের পারস্পারিক বিশ্লেষণ: (differential diagnosis- D/D):  কেসটিতে ব্রায়োনিয়া, সালফার ও নেট্রামমিউর খুবই সাদৃশ্যযুক্ত ও  নিকট সম্পর্কযুক্ত (close remedy) বলে মনে হয়েছে। কিন্তু ব্রায়োনিয়ার সাথে পার্থক্য নির্ণয়ে একটি লক্ষণই যথেষ্ট ছিল। আর তা হলো: সামান্য নড়াচড়ায় বৃদ্ধি (aggravation from slightest motion)। ওষুধ: তাকে সার্বিক লক্ষণ বিশ্লেষণ করে ”ব্রায়োনিয়া” প্রয়োগ করা হয়। রোগী খুব দ্রুত তার দীর্ঘদিনের কষ্ট হতে উপশম পেতে শুরু করেন। ওষুধ প্রয়োগের ২/৩ দিন পর হতে মলত্যাগের পুন: পুন: মাত্রা কমতে থাকে। উল্ল্যেখ্য রোগী এর আগে অনেক ওষুধ সেবন করলেও কোন ফল পাননি। তাই হোমিওপ্যাথিক ক্ষুদ্র মাত্রার ওষুধের কার্যকারিতা তার কাছে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা বলে তিনি বর্ণনা করেন। রোগী তার বিরক্তিকর মাথাব্যথা থেকেও মুক্তি পান। কিছু দিনের মধ্যেই তার ডায়রিয়া ও ঘন ঘন মলত্যাগ সমস্যাটি চলে যায়। তিনি কোন লক্ষণের বৃদ্ধি ছাড়াই সব খাবার খেতে শুরু করেন। এটা তার জন্য শারীরিক ও মানসিক চাপ হতে মুক্তি।       

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.