রোগ আরোগ্য কত সময় লাগে?

প্রায়ই এই প্রশ্ন করা হয় আমাকে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে আজ এ প্রশ্নের জবাব দিব।

বিশ্বখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস তার ৬০+ বছরের অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন যুগান্তকারী বই “Levels of Health”. যার মূল প্রতিপাদ্য – কি দেখে আমরা বুঝবো রোগীর আরোগ্য সম্ভাবণা (Prognosis) কতটুকু এবং আরোগ্যে কত সময় লাগতে পারে।

এ বইয়ে তিনি মানুষকে ৪ টি গ্রুপে ১২ টি লেভেলে বিভক্ত করেছেন।

Group A (লেভেল ১-৩): স্বাস্থ্যের শীর্ষ বা উচ্চতম স্তর এটি।

লেভেল -১: এই স্তরে রোগীর অধিকাংশ রোগের ক্ষেত্রে তার অংগ প্রত্যংগের কার্যগত বিশৃংখলা (Functional disorder) দেখা যায়, যেমন – মৃদু মাথাব্যথা, একজিমার মত চর্মরোগ, মাসিকপূর্ব লক্ষণ (premenstrual syndrome) যেখানে এন্ডোমেট্রিওসিস থাকেনা (without endometriosis), এক ধরণের কোমর ব্যথা (sciatica)। এছাড়া মৃদু আকারে শিরা-ধমনী ও পেশীর ব্যথা (articular and muscular pain)। বলা বাহুল্য লেভেল – ১ এ বিশ্বব্যাপী মানুষের সংখ্যা দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ভেদে ৩-৫% মাত্র।  লেভেল – ১ এ একিউট রোগ হয়না।

মাঝে মধ্যে হালকা ইনফেকশন ও উচ্চ জ্বর (১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাই বা তার অধিক) শুরু হয় লেভেল – ২ থেকে। রোগ ভোগ শেষে এই ইনফেকশন ও উচ্চ জ্বর রোগীর সাধারণ স্বাস্থ্যে তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনা। এখানে সেই ধরণের জীবাণুর প্রভাব থাকে যা সাধারণত এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট নয় যেমন – Staphylococcus ও Streptococcus. এই লেভেলের রোগীর নিরাময়ে রোগীর লক্ষণাবলী অত্যন্ত স্পষ্ট এবং লক্ষণাবলী বিশ্লেষণে সুনির্দিষ্ট ওষুধই নির্বাচিত হয়। রোগীর মধ্যে বহুমাস যাবত এমনকি বছরাধিক কাল ওষুধের কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচিত ওষুধ প্রয়োগে লেভেল ২ ও ৩ এর ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে প্রারম্ভিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়না। রোগ আরোগ্য খুব কম সময় লাগে।

Group B (Level 4-6): এই গ্রুপের মূল বৈশিষ্ট্য ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা। এই গ্রুপের রোগীর একিউট রোগ সহ ঘন ঘন সংক্রামক রোগ হয়। লেভেল অব হেলথ্ যত নিম্নগামী হতে থাকে ততো ঘন ঘন ও তীব্রতা সহ ইনফেকশনজনিত রোগ দেখা দেয় (যেমন- Pneumonia ও pyelonephritis)। যে সকল জীবাণু রোগীকে আক্রমণ করে সেগুলো অধিকতর মারাত্মক এবং অধিক এন্টিবায়োটিক রেজিষ্ট্যান্ট। যেমন – Proteus ও Pseudomonas সংক্রমণ। সঠিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা চলাকালীন রোগীর একিউট রোগের তীব্রতা হ্রাস পেতে থাকে এবং রোগের পুন: পুন: আক্রমণের পুনরাবৃত্তি ঘন ঘন না হয়ে বিলম্বে হতে থাকবে। এ অবস্থায় ও রোগীর লক্ষণাবলী সুনির্দিষ্ট ১ টি ওষুধ নির্দেশ করবে। কিন্তু সফল চিকিৎসার জন্য ২-৫ টি ওষুধ ও প্রয়োজন হতে পারে। এ সকল স্তরের রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগে সাময়িক লক্ষণের বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে, যা আরোগ্যদায়ক।

Group C (Level 7-9): এই গ্রুপে রোগসমূহ অত্যন্ত মারাত্মক ও তীব্র। রোগগুলো মুলত: অংগের কাঠামোগত বিশৃংখলা সৃষ্টি করে যেমন – Crohn’s disease, colitis ulcerosa, bronchial asthma, collagen, diseases, epilepsy, autoimmune diseases, Meniere’s disease, Parkinson’s disease; psychological illness যেমন – anxiety disorder, phobias, depression ইত্যাদি।

লেভেল – ৭ এ পৌঁছে গেলে ও রোগীর সামান্য কিছু একিউট রোগ হতে পারে কিন্তু রোগগুলি অত্যন্ত মৃদু এবং উচ্চজ্বরের পরিবর্তে নিম্ন তাপমাত্রাসহ জ্বর থাকে। কোন ওষুধ সেবন ছাড়াই রোগভোগ শেষ হয়।  

লেভেল – ৮ ও ৯ এর রোগী পৌঁছালে একিউট রোগ হবার প্রবণতা আর লক্ষ্য করা যায়না। অর্থাৎ রোগী ক্রণিক রোগে ভুগতে শুরু করে। ক্রণিক রোগের চিকিৎসাকালীন একিউট রোগের পুন: প্রাদৃর্ভাব দেখা দিতে পারে যা অত্যন্ত আরোগ্যদায়ক ও ইতিবাচক । রোগ প্রতিরোধ অবস্থা বিশ্লেষণ করে এক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে একাধিক ওষুধ প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এই লেভেলে রোগীর লক্ষণাবলী স্পষ্ট দেখায় না। এ পর্যায়ে একটি লেভেলের ভেতর অন্য সাব-লেভেল বা উপ স্তরের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। সঠিক ওষুধ প্রয়োগে সাধারণত লক্ষণসমূহের তীব্রতাসহ ও কিছুটা দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়।

Group D (Level 10-12): গ্রুপ – ডি এর রোগীর রোগসমূহ অনেক বেশী মারাত্মক এবং অংগ প্রত্যংগের বিস্তৃত কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যায় যেমন – মেটাসটেসিস সহ ক্যান্সার, সিরোসিস, মারাত্মক হৃদরোগ। এছাড়া AIDS, কিশোর ডায়বেটিস (juvenile diabetes), ক্রণিক রোগের শেষ পর্যায় (final stages of chronic disease), neuromuscular diseases যেমন- Amyotrophic lateral sclerosis (ALS), গুরুতর মৃগী রোগ (serious epileptic conditions), schizophrenia, Alzheimer’s ইত্যাদি দেখা যায়।

এই পর্যায়ে একিউট রোগ বলতে গেলে হয়না, তবে একিউট রোগ হলে তা প্রাণনাশক হতে পারে। কারণ, রোগী তার ধকল নিতে পারেনা।

এ পর্যায়ে লক্ষণাবলী স্পষ্ট দেখায় না। লক্ষণানুযায়ী ওষুধ প্রয়োগের ফলেও সার্বিক লক্ষণাবলী দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে তাই প্রতিবার ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। এই সর্বনিম্ন লেভেলে হোমিওপ্যাথি কেবল উপশম দিতে পারে বা রোগকে একটি স্তরে থামিয়ে রাখতে পারে মাত্র। এই লেভেলে প্রারম্ভিক লক্ষণ বৃদ্ধি পায়না বরং সচরাচর উপশমকারী উন্নতি দেখা যায়।

সারাংশ হিসেবে একথা বলা যায় যে, সকল রোগীর লক্ষণসমূহ একই স্তরে নয়। লেভেল অনুযায়ী লক্ষণের স্পষ্টতা, ইনফেকশন সহ একিউট রোগের প্রাদুর্ভাব, ক্রণিক রোগের নানান পর্যায় এবং অংগপ্রত্যংগের কার্যগত বিশৃংখলা হতে কাঠামোগত বিশৃংখলা অনুযায়ী রোগ নিরাময়ে কয়েক ঘন্টা হতে দিন-মাস বা বছর ও গড়াতে পারে। লক্ষণ স্পষ্ট না পাওয়ার এবং ক্রণিক ও জটিল রোগের অন্যতম কারণ দমনমূলক আধুনিক চিকিৎসা। যেখানে এক পর্যায়ে অধিকাংশ রোগই অনিরাময়যোগ্য ঘোষণা করা হয় ও জীবনভর চিকিৎসা চালানোর পরামর্শ দেয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *